আজকাল কতো স্টাইল দেখা যায় মুখে। লম্বা গোফেও মুসলমানরা নানা বিকৃতি করেন আর দাড়িকেও দাঁড় করান অধুনা নানা আকৃতির সাজে। কাটিং করে ফেইসের গেটাপ চেঞ্জ করা যেনো আজ অভিশপ্ত ট্রেন্ডিংয়ে রূপ নিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে হেফাজত করুন।
দাড়িকে ইসলামের শিআর ও পরিচয়-চিহ্ন হিসেবে গণ্য করা হয়। দাড়ি লম্বা করা এবং গোঁফ খাটো করা ইসলামের অনুপম শিক্ষা; যা সকল নবীর শরীয়তে বিদ্যমান ছিল। দাড়ি লম্বা রাখা ওয়াজিব এবং এক মুষ্ঠি থেকে খাটো করা নাজায়েয।
একাধিক হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়ি রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেন—‘তোমরা গোঁফ খুব ছোট করো এবং দাড়ি লম্বা রাখো।-বুখারী/ হাদীস ৫৫৫৪
আরেক হাদীসে নবীজি সা. বলেন—তোমরা গোঁফ কাটো এবং দাড়ি লম্বা রাখো।-মুসনাদে আহমাদ/৯০২৬
দাড়ি মুণ্ডন করা হারাম; এটি জমহুর ফুকাহায়ে কেরামের মাযহাব। হানাফী, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাব এবং শাফেয়ী মাযহাবের একাংশও এ মতের প্রবক্তা। বরং এ বিষয়ে ইজমা সংঘটিত হওয়ার কথাও বর্ণিত হয়েছে। অনুরূপভাবে দাড়ি উপড়ে ফেলা (চেঁছে তুলে ফেলা) এবং অধিকাংশ অংশ কেটে ছোট করা বৈধ নয়।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
সে বলল, “হে আমার মায়ের সন্তান! তুমি আমার দাড়ি ধরো না এবং আমার মাথার চুলও ধরো না।”
আল-কুরআন, সূরা ত্বহা ২০:৯৪
এ আয়াত দ্বারা একথাও বুঝা যায় যে, হযরত হারুন আ. এর দাড়ি এক মুষ্ঠির চেয়ে কম ছিল না। কারণ এক মুষ্ঠির চেয়ে কম দাড়িতে মুঠ করে ধরা যায় না।
হাদিসে এসেছে—
তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা কর; দাড়ি লম্বা রাখো এবং গোঁফ ছোট করো। আর আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. হজ বা উমরা আদায় করার সময় দাড়ির ক্ষেত্রে একটি আমল করতেন। তিনি মুঠি দিয়ে দাড়ি ধরতেন, এরপর অতিরিক্ত অংশ (মুঠির বাইরে থাকা অংশ) কেটে ফেলতেন। সহিহ বুখারি, হাদীস নং ৫৮৯২
দাড়ি লম্বা রাখার বিষয়ে হাদীসে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন—দাড়িকে পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া, বৃদ্ধি করা এবং স্বাভাবিকভাবে লম্বা রাখার নির্দেশার্থে বিভিন্ন বর্ণনা এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
“মুশরিকদের বিরোধিতা কর, দাড়ি বৃদ্ধি কর এবং গোঁফ ছাঁটো।”(আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. সূত্রে—সহীহ বুখারী, ২/৮৭৫)
অন্য বর্ণনায় এসেছে—“মুশরিকদের বিরোধিতা কর, গোঁফ ছাঁটো এবং দাড়ি পূর্ণ কর।” (আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. সূত্রে— মুসলিম, ১/১২৯
আরেক বর্ণনায় এসেছে—“গোঁফ উত্তমভাবে ছোট কর এবং দাড়ি লম্বা কর।” (আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. সূত্রে — সহীহ বুখারী, ২/৮৭৫)
এছাড়া এসেছে—“গোঁফ কেটে ফেল এবং দাড়ি ছেড়ে দাও; অগ্নিপূজকদের বিরোধিতা কর।” (আবু হুরায়রা রা. সূত্রে — সহীহ মুসলিম, ১/১২৯)
নিঃসন্দেহে দাড়ি মুণ্ডন করা এবং একে বৃদ্ধি না করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদত্ত এসব নির্দেশনার সম্পূর্ণ বিরোধী। এসব হাদীসে ব্যবহৃত আদেশসূচক ক্রিয়ার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে দাড়ি লম্বা রাখা ও এতে হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আর মূলনীতি হলো—শরীয়তের আদেশ সাধারণত ওয়াজিব অর্থে প্রযোজ্য হয়, যতক্ষণ না ভিন্ন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত: দাড়ি মুণ্ডন করার মধ্যে কাফিরদের সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উমর এবং আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—“যে পুরুষ নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে এবং যে নারী পুরুষদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উপর লানত করেছেন।” সহীহ বুখারী ৫৮৮৫
এই বক্তব্যের ভিত্তিতে ফকীহগণ বলেন, দাড়ি মুণ্ডন করা—যা আল্লাহ তাআলা পুরুষের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন—নারীদের সাথে সাদৃশ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আদাবুয যিফাফ, পৃষ্ঠা ২১০, শাইখ আলবানী
হাশিয়াতু ইবনে আবেদীন ২/৪১৮, ফাতহুল কাদীর ২/৩৪৭, হাশিয়াতুল আদাওয়ী ২/৫৮০, আয-যাখীরা ১৩/২৭৮, মাতালিবু উলিন নুহা ১/৮৫, ই‘আনাতুত তালিবীন ২/৩৮৬, মারাতিবুল ইজমা ১৫৭ পৃ. আল ইকনা ফি মাসায়িলিল ইজমা ২/২৯৯, আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখিসে কিতাবি মুসলিম ১/৫১২
এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত দাড়ি কাটার শরঈ বিধান
দাড়ি যদি এক মুষ্ঠির বেশি হয়ে যায়, তবে অতিরিক্ত অংশ কাটার অনুমতি রয়েছে। এটি হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের অভিমত। মালিকী মাযহাবের আলেম আল-বাজী-ও এ মত গ্রহণ করেছেন। অনুরূপভাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ-ও এ মতের পক্ষাবলম্বন করেছেন। এটি সালাফের একদল আলেমের অভিমত হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে।
হাদীস ও আছারের কিতাবসমূহে পাওয়া যায় যে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. এবং আবু হুরায়রা রাযি. এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত দাড়ি কেটে ফেলতেন।
সহীহ বুখারীতে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. হজ বা উমরা আদায় করার সময় দাড়ির ক্ষেত্রে একটি আমল করতেন। তিনি মুঠি দিয়ে দাড়ি ধরতেন, এরপর অতিরিক্ত অংশ (মুঠির বাইরে থাকা অংশ) কেটে ফেলতেন। সহিহ বুখারি, হাদীস নং ৫৮৯২
আবু যুরআ রাহ. বলেন, আবু হুরায়রা রা. তাঁর দাড়ি মুঠ করে ধরতেন, এরপর এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ১৩/১১২, হাদীস: ২৫৯৯২; ২৫৯৯৯
নাফে রহ. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত দাড়ি কেটে ফেলতেন। মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস: ২৫৯৯৭
আর হাসান বসরী রহ. বলেন, সাহাবা ও তাবিয়ীগণ এক মুষ্ঠির অতিরিক্ত দাড়ি কাটার অবকাশ দিতেন।
মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ১৩/১১২, হাদীস: ২৫৯৯৫
তবে কোনো সহীহ মারফূ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সরাসরি বর্ণনা) হাদীসে এক মুষ্ঠির ভেতরে দাড়ি কাটার অনুমতি পাওয়া যায় না।
সাহাবা ও তাবিয়ীদের আমল পূর্বোক্ত মারফূ হাদীসের ব্যাখ্যা হিসেবে গণ্য। অতএব হাদীস ও আছারের সমন্বিত দৃষ্টিতে দাড়ি লম্বা রাখা শরঈ নির্দেশ, এবং এক মুষ্ঠির কম রাখা সম্পর্কে সরাসরি মারফূ হাদীসে কোনো অনুমতি পাওয়া যায় না।
ইমাম হাসকাফী রহ. বলেন: “দাড়ি থেকে এক মুষ্ঠির কম অংশ কেটে ফেলা—যেমন কিছু মাগরিবের লোকজন এবং নারীতুল্য স্বভাবের পুরুষরা করে থাকে—এটি কারো নিকটই বৈধ বলে স্বীকৃত নয়।” আদ-দুররুল মুখতার ২/৪১৮
একমুষ্ঠির কম দাড়ি কাটা বৈধ নয়। সবদিকে সমান ও সুন্দর করার নিয়তেও একমুষ্ঠির কম দাড়ি কাটা যাবে না। চোয়ালের দাড়ি ছোট থাকলেও থুতনির দাড়ি যদি একমুষ্ঠির বেশি হয় তাহলে সেখান থেকে অতিরিক্ত অংশ কাটা যাবে। একমুষ্ঠির বেশি দাড়ি কাটার নিয়ম হল, থুতনির নিচে মুষ্ঠি করে ধরার পর অতিরিক্ত অংশ কেটে নেওয়া।
কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মদ ২/৭৬৬; ফাতহুল বারী ১০/৩৬৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩৫৮; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৪০৭; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৮/২১১; রদ্দুল মুহতার ২/৪১৮, ৬/৪০৭
ঠোঁটের নিচে যেসব পশম গজায় তা মুণ্ডিয়ে বা উপড়ে ফেলা নিষেধ। একে নিমদাড়ি বলে। একাধিক বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিমদাড়ি রাখতেন। হযরত হারীয ইবনে উসমান রাহ. হতে বর্ণিত—তিনি সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে বুসরকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কি বৃদ্ধ দেখেছেন? তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিমদাড়িতে কয়েকটি চুল সাদা ছিল। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৫৪৬)
অবশ্য গলার নিচে যেসব পশম গজায় তা প্রয়োজনে কাটা যাবে।
শরহু সহীহি মুসলিম, নববী ৩/১৪৯; ফায়যুল বারী ৪/৩৮০; আলইয়ানাবী‘ ২/৪২৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩৫৮; রদ্দুল মুহতার ৬/৪০৭
লেখক: আলেম, সাংবাদিক
