- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

দিরাইয়ে বিয়ের প্রলোভনে প্রেমের সম্পর্ক, প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণ, টাকা-স্বর্ণালংকার আত্মসাতের অভিযোগ, মামলা দায়ের

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীর সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পর্ক স্থাপন, বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার নেওয়া এবং পরবর্তীতে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগ উঠেছে লেচু মিয়া (৩৬) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ওই নারীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর চেষ্টা এবং একপর্যায়ে কাঠের বর্গা দিয়ে হামলার চেষ্টার অভিযোগও করা হয়েছে। এসব অভিযোগে মোছা. পারভিন বেগম নামে এক নারী দিরাই আমল গ্রহণকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন। আদালতে দাখিল করা দরখাস্তে উল্লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে এসব তথ্য জানা গেছে।

পরিচয় থেকে সম্পর্ক

এরপর বিয়ের আশ্বাস আদালতে দেওয়া অভিযোগে পারভিন বেগম উল্লেখ করেন, খালার বাড়িতে আসা-যাওয়ার সুবাদে দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের কর্ণগাঁও বাজারে লেচু মিয়ার কফি হাউজে কেনাকাটার সূত্রে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচয়ের পর লেচু মিয়া তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। পরে মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে নিয়মিত যোগাযোগ করেন এবং বিয়ে করে সংসার করার আশ্বাস দেন। বাদীর দাবি, প্রায় দুই বছর ধরে তাদের মধ্যে ফোনে কথাবার্তা চলতে থাকে। একপর্যায়ে তারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

মামলার দরখাস্তে বাদী

দাবি করেন, পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, জগন্নাথপুরে পরিচিত ব্যক্তির বাড়ি এবং দিরাই পৌর শহরের গোলাপনগর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় তারা প্রায় তিন মাস স্বামী-স্ত্রী মতো বসবাস করেন। এ সময় লেচু মিয়া তাকে বিয়ে করে ঘরে তুলে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২২ সালের ৩০ জুলাই লেচু মিয়া তাকে সুনামগঞ্জ শহরে ডেকে নেন। পরে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া করে তাকে সেখানে রাখেন। সেখানে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ করেন বাদী।

টাকা ও স্বর্ণালংকার নেওয়ার অভিযোগ

বাদীর অন্যতম প্রধান অভিযোগ, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার নেওয়া হয়েছে। দরখাস্তে তিনি দাবি করেন, লেচু মিয়াকে বিয়ে করে সংসার করার আশায় নিজের জমানো অর্থ ও স্বর্ণালংকার বিক্রি করে বিভিন্ন সময়ে ওই টাকা দেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিয়ের জন্য চাপ দিলে লেচু মিয়া নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে কথিত ১০ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকারের লেনদেনের বিষয়টি তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। টাকা লেনদেনের মাধ্যম, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের রেকর্ড, স্বর্ণালংকার হস্তান্তরের প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অন্তঃসত্ত্বা ও গর্ভপাতের অভিযোগ
মামলার দরখাস্তে বাদী আরও অভিযোগ করেন, লেচু মিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দিরাইয়ের কর্ণগাঁও পয়েন্টের পল্লী চিকিৎসক নিশিকান্ত দাসের মাধ্যমে ওষুধ খাওয়ানো হয় বলে দাবি করেন তিনি। এতে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন বাদী। তবে গর্ভপাতের এ অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ বিষয়ে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার বিষয়।

কাঠের বর্গা দিয়ে হামলার চেষ্টার অভিযোগ
মামলার দরখাস্তে ১৩ জুলাই ২০২৬ সালের একটি ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ, ওই দিন বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে কয়েকজন সাক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি করিমপুর ইউনিয়নের নতুন কর্ণগাঁও পয়েন্টের আল কাইয়ুম কফি হাউজে যান। সেখানে সামাজিকভাবে বিয়ে করে তাকে ঘরে তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিলে লেচু মিয়া দোকানঘর থেকে কাঠের বর্গা হাতে নিয়ে তার ওপর হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। উপস্থিত ব্যক্তিদের সহায়তায় তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন বলে আদালতের দরখাস্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাঁচ সাক্ষীর নাম উল্লেখ
বাদীপক্ষের অভিযোগে পাঁচজন সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন- কর্ণগাঁও এলাকার ফখরুল ইসলাম, মাজেদা বেগম, হাফিজ মিয়া ও মাজেদুল ইসলাম এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলার শ্যামনগর গ্রামের মিনারা বেগম। বাদীর দাবি, এসব সাক্ষী বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে অবগত এবং প্রয়োজন হলে আদালতে সাক্ষ্য দেবেন।

থানায় অভিযোগের পর আদালতে মামলা
বাদী অভিযোগে উল্লেখ করেন, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। পরে তিনি দিরাই থানায় অভিযোগ করেন। থানা কর্তৃপক্ষের পরামর্শে আদালতের আশ্রয় নেন বলে দাবি করেন তিনি। এরপর ৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আদালতে দরখাস্ত দাখিল করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন পারভিন বেগম। তিনি অভিযোগটি আমলে নিয়ে দিরাই থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করেছেন।

অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া যায়নি:

অভিযোগের বিষয়ে লেচু মিয়ার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে প্রতিবেদক মুঠোফোনে জানতে চাইলে দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত শেষে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।

তদন্তে যেসব বিষয় যাচাই প্রয়োজন
মামলাটিতে বাদীর অভিযোগের পাশাপাশি অভিযোগের পক্ষে থাকা তথ্য-প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১০ লাখ টাকার কথিত লেনদেনের ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের রেকর্ড, স্বর্ণালংকার দেওয়ার প্রমাণ, হোটেলের রেজিস্টার বা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও যোগাযোগের তথ্য এবং অভিযোগে উল্লেখিত সাক্ষীদের বক্তব্য যাচাই করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে গর্ভপাতের অভিযোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বক্তব্যও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে আদালতে দাখিল করা অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত নয়। তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই অভিযোগগুলোর সত্যতা ও দায়-দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন