তিন বছরের বাড়ির কর পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারি রসিদে করের পরিমাণ ৪ হাজার ১৪৭ টাকা অথচ করদাতার কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সুনামগঞ্জের দিরাই সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বচ্ছতা নিয়ে, অভিযোগের তীর উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা নুর আলীর দিকে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ (ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত), গত ১৭ অক্টোবর দিরাই পৌরসভার শুকুরনগর গ্রামের জুনু মিয়া ও মোশাহিদ মিয়া তাঁদের বাড়ির কর পরিশোধ করতে দিরাই সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান, এ সময় তিন বছরের কর বাবদ তাঁদের কাছে ১৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়, পরে আলোচনা ও দর-কষাকষির একপর্যায়ে ৯ হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। কিন্তু টাকা পরিশোধের পর হাতে দেওয়া রসিদে উল্লেখ করা হয় মাত্র ৪ হাজার ১৪৭ টাকা। ফলে অভিযোগ অনুযায়ী, পরিশোধিত অর্থ ও রসিদের অঙ্কের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৫৩ টাকা। এই অতিরিক্ত অর্থ কেন নেওয়া হলো, তার হিসাব নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
ভুক্তভোগী মোশাহিদ মিয়ার অভিযোগ, উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা নুর আলী তাঁদের কাছে প্রথমে ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে ৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়। অথচ রসিদে লেখা হয়েছে ৪ হাজার ১৪৭ টাকা।
মোশাহিদ মিয়ার ভাষ্য, তাঁরা বাড়ির কর পরিশোধ করতে গিয়েছিলেন কিন্তু টাকা দেওয়ার পর রসিদে কম অঙ্ক দেখে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারি করের নির্ধারিত অঙ্কের বাইরে টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে, সেই অর্থের হিসাব কী-এ প্রশ্নের জবাব চান তাঁরা। ভুক্তভোগীরা আরও জানান, পরবর্তী সময়ে অফিস বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীদের সরবরাহ করা রসিদের তথ্য অনুযায়ী, দিরাই সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ওই রসিদে দাগ নম্বর ১৩৩৯, জমির শ্রেণি ‘বাড়ি (আবাসিক)’ এবং গত তিন বছরের মোট আদায় ৪ হাজার ১৪৭ টাকা উল্লেখ রয়েছে। সর্বশেষ কর পরিশোধের সাল হিসেবে লেখা আছে ২০২৬-২০২৭।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের দাবি, তাঁরা দিয়েছেন ৯ হাজার টাকা। সে হিসাবে রসিদে উল্লেখিত অঙ্কের বাইরে রয়েছে ৪ হাজার ৮৫৩ টাকা। এখানেই প্রশ্ন-অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়ে থাকলে তা কোন খাতে নেওয়া হয়েছে? ওই অর্থের কোনো পৃথক সরকারি রসিদ রয়েছে কি না? সরকারি কোষাগারে পুরো টাকা জমা হয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী টাকা লেনদেনের সময় মোছা. সাহেদা বেগম, মোশাহিদ মিয়া, ওয়ারিছ উল্লা ও নাজমুল মিয়া উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা নুর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য- তাঁর অফিসে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। অভিযোগকারীদের তাঁর কাছে নিয়ে আসার কথাও বলেন তিনি।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজীব সরকার, যিনি ভারপ্রাপ্ত ভূমি কর্মকর্তার দায়িত্বেও রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন- সরকারি ছুটিতে তিনি বাড়িতে থাকায় এ বিষয়ে কিছু জানেন না। সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভূমি অফিস নাগরিকদের জমি ও ভূমি-সংক্রান্ত সরকারি সেবার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সেখানে কর আদায়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে রসিদ, কর নির্ধারণের হিসাব, অর্থ গ্রহণের রেকর্ড এবং সরকারি কোষাগারে জমার তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না মিললে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
রসিদে ৪ হাজার ১৪৭ টাকা, অথচ ৯ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ-এই ব্যবধানের নির্ভুল হিসাব কোথায়? সরকারি কর আদায়ের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্নের উত্তর শুধু আশ্বাসে নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাব ও নিরপেক্ষ তদন্তে করে দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
