সকাল সাড়ে ৬টা। রাজধানীর রাস্তা প্রায় ফাঁকা। তবে রমনা পার্কের প্রবেশমুখে অনেকগুলো গাড়ি। ভেতরে হাঁটছিলেন শ দেড়েক মানুষ। তার মধ্যে জনাপঞ্চাশেক নারী। পোশাক দেখলেই বোঝা যায়, তাঁরা মধ্যবিত্ত অথবা উচ্চবিত্ত।
রমনা পার্ক পরিচ্ছন্ন। রাস্তাগুলো মসৃণ। অবকাঠামো ভালো। লেকের পানি বেশ পরিষ্কার। চিপসের প্যাকেট বা আবর্জনা খুব একটা দেখা গেল না। শৌচাগারের ব্যবস্থাও ভালো। সেখানে হাঁটার জন্য নিয়মিত যান কয়েক শ মানুষ; আর দর্শনার্থী থাকেন হাজার হাজার।
ঠিক উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। রমনায় ঘণ্টা দুয়েক ঘোরার পর গেলাম সেখানে। দেখা গেল, পার্কটি ময়লা-আবর্জনায় ভরা। অনেক জায়গায় দুর্গন্ধ। হাঁটার পথ অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা। ভবঘুরেদের দেখা গেল, মাদক কেনাবেচা ও সেবন করতে দেখা গেল। নিরাপত্তার অভাবটাও বোঝা গেল।
রমনা পার্ক পরিচ্ছন্ন। রাস্তাগুলো মসৃণ। অবকাঠামো ভালো। লেকের পানি বেশ পরিষ্কার। চিপসের প্যাকেট বা আবর্জনা খুব একটা দেখা গেল না। শৌচাগারের ব্যবস্থাও ভালো। সেখানে হাঁটার জন্য নিয়মিত যান কয়েক শ মানুষ; আর দর্শনার্থী থাকেন হাজার হাজার।
সব মিলিয়ে পাশাপাশি দুই পার্কের চিত্র দুই রকম। দুটি পার্কেই সরকার যথেষ্ট টাকা খরচ করেছে; কিন্তু ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়েছে রমনার ওপর। কারণ, সেখানে সরকারের আমলা ও সচ্ছল মানুষেরা হাঁটতে যান। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ‘মাদকের আখড়া’ই রয়ে গেছে।
রমনা পার্কে গত ২৭ আগস্ট গিয়ে পাওয়া যায় সাবেক যুগ্ম সচিব মিজানুর রহমানকে। পরনে হাঁটার পোশাক। পায়ে কেডস। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শরীর ঠিক রাখতে তিনি নিয়মিতই ভোরে রমনা পার্কে হাটেন। পার্কটির পরিবেশ ভালো ও নিরাপদ। তাই রমনায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যান কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দু-একবার গিয়েছি। তবে পরিবেশ ভালো না।’
ঠিক উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। রমনায় ঘণ্টা দুয়েক ঘোরার পর গেলাম সেখানে। দেখা গেল, পার্কটি ময়লা-আবর্জনায় ভরা। অনেক জায়গায় দুর্গন্ধ। হাঁটার পথ অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা। ভবঘুরেদের দেখা গেল, মাদক কেনাবেচা ও সেবন করতে দেখা গেল। নিরাপত্তার অভাবটাও বোঝা গেল।
ইতিহাস ও আকার কাছাকাছি
রমনা ও সোহরাওয়ার্দীর ইতিহাস কাছাকাছি। মুনতাসীর মামুনের ঢাকা সমগ্র বইয়ে লেখা আছে, রমনা ফারসি শব্দ। মানে ল’ন। মোগলরা এই নাম দিয়েছিল। মোগল আমলে রমনা বলতে মূলত এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকাটিকে বোঝানো হতো। যেটি ছিল সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর। রমনার (এখনকার সোহরাওয়ার্দী) উত্তরে ছিল জঙ্গল। ভেতরে ছিল কয়েকটি খাল।
মুনতাসীর মামুনের লেখা অনুযায়ী, মোগলরা বিদায় নেওয়ার পর ঢাকার জনসংখ্যা কমে যায়। বহু এলাকা পরিত্যক্ত হয়। রমনাও তখন পরিণত হয় জঙ্গলে।
১৯২৫ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ড’স জেলের কয়েদিদের দিয়ে জঙ্গল কেটে বৃহত্তর রমনা এলাকা পরিষ্কার করেন। তৈরি করেন ঘোড়দৌড়ের মাঠ। পাকিস্তান আমলে শাহবাগ থেকে ইডেন বিল্ডিং (বর্তমান সচিবালয়) পর্যন্ত নতুন একটি রাস্তা করা হয় এবং এই রাস্তার পূর্ব দিকের অংশ হয় বর্তমান রমনা পার্ক। অন্য পাশের মাঠটি আগে থেকে ‘রেসকোর্স’ নামে পরিচিত ছিল।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানের মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ১৯৭২ সালে রেসকোর্স ময়দানের নাম পরিবর্তন করে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’ রাখা হয়।
রমনা পার্কের আয়তন ৬৮ দশমিক ৫ একর এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আয়তন ৬৮ একর। রমনা পার্কের একদিকে মন্ত্রিপাড়া, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা, ঢাকা ক্লাব, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ বিভিন্ন স্থাপনা। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ইত্যাদি স্থাপনা রয়েছে।
ব্যয়ের দিক দিয়ে এগিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সেখানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যয় ছিল ২৬৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ব্যয় ৩৯৭ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় উদ্যানজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। থিম পার্ক, গাড়ি রাখার ভূগর্ভস্থ পার্কিং, লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো, ফোয়ারাসহ ১০টি স্থাপনা নির্মাণের কাজ ঢিমেতালে চলছে। একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানোর পর প্রকল্পটির সময়সীমা সর্বশেষ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় উদ্যানের মধ্যে অবস্থিত স্বাধীনতা জাদুঘরে হামলা চালানো হয়। তারপর থেকে সেটি বন্ধ।
রমনা পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনে ২০১৮ সালে ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই অর্থে হাঁটার জন্য আধুনিক ওয়াকওয়ে, লেকের পাশে কাঠের হাঁটার পথ, টয়লেট এবং শরীরচর্চার উপকরণ স্থাপনসহ পার্কে দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।
অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রমনা পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনে ২০১৮ সালে ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই অর্থে হাঁটার জন্য আধুনিক ওয়াকওয়ে, লেকের পাশে কাঠের হাঁটার পথ, টয়লেট এবং শরীরচর্চার উপকরণ স্থাপনসহ পার্কে দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।
নগর–পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো পার্কের চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব স্থাপনা করে উদ্যানের চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে, এটি এখন অনেকটা কংক্রিটে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, রমনায় অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা না থাকায় এখনো পার্কের চরিত্রটি টিকে আছে।
আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, বিনিয়োগের পাশাপাশি যথাযথ তদারকির কারণে রমনা পার্ক পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল রয়েছে। শুধু বিনিয়োগ করলেই যে পার্ক ভালো রাখা যায় না, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তার উদাহরণ।
সরেজমিনে গত ২৫ ও ২৭ আগস্ট এবং ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর দুটি পার্কের পরিস্থিতি দেখেছি।
দেখা যায়, রমনা পার্কের প্রবেশ ফটকে জনসাধারণের জন্য ১৫টি নির্দেশনা-সংবলিত ব্যানার টানানো রয়েছে। সেখানে হকার প্রবেশ, সভা-সমাবেশ ও গণজমায়েত, মাদক বহন, গ্রহণ, কেনাবেচা এবং স্কুল-কলেজের পোশাক পরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পার্কটি সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার আওতাভুক্ত বলেও সতর্কবার্তা রয়েছে।
সরেজমিনে গত ২৭ আগস্ট দেখা যায়, এক ব্যক্তি ধূমপান করতে করতে পার্কে ঢোকার চেষ্টা করলে তাঁকে বাধা দেন আনসার সদস্যরা। কোথাও কাউকে ময়লা ফেলতে বা যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করতে দেখা গেল না।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বরত আনসার সদস্য কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, পার্কে যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, সেগুলো কঠোরভাবে পালনের নির্দেশনা আছে।
রমনা পার্ক সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এর মোট ৮টি ফটকের মধ্যে ৫টি দিয়ে মানুষ প্রবেশ করতে পারে। এসব ফটকে পাহারার জন্য ৩৫ জন আনসার সদস্য রয়েছেন। পরিচ্ছন্নতার কাজে রয়েছেন ২২ জন কর্মী। পাঁচটি আধুনিক শৌচাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১২ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন। বাগান পরিচর্যা ও ঘাস কাটার জন্য মালির ব্যবস্থাও রয়েছে।
নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, রমনা পার্কের স্টেকহোল্ডার (অংশীজন) শুধু গণপূর্ত বিভাগ; কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্টেকহোল্ডার গণপূর্ত, সিটি করপোরেশন ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। রমনার দায়িত্ব একটি সংস্থার কাছে থাকার কারণে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, পার্ক দুটির অবস্থানের বাস্তবতাও একটি ব্যাপার। রমনা পার্কের পাশে মন্ত্রিপাড়া। এখানে সচিব ও আমলাদের যাতায়াত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থপনা। স্বাভাবিকভাবে চাইলেও এটা যথাযথভাবে মেইনটেইন (রক্ষণাবেক্ষণ) করা সম্ভব হয় না।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এর ৭টি ফটকে ৪০ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্য ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কারণ, কাউকে আটকাতে দেখা যায়নি। সেখানে পরিচ্ছন্নতার কাজে রয়েছেন সাত কর্মী। উদ্যানে পরিচ্ছন্ন শৌচাগার নেই, মালি নেই, বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁদের বাজেট থেকে রমনা পার্কে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কারকাজ করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রকল্পের কাজ চলায় সেখানে আলাদা করে রক্ষণাবেক্ষণের বরাদ্দ নেই।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকের কারবার, মারামারি, ছিনতাই ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমনকি উদ্যানের ভেতরে হত্যাকাণ্ডও ঘটে। গত বছরের ১৩ মে রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে ছুরিকাঘাতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জাতীয়বাদীবাদী ছাত্রদলের নেতা এস এম শাহরিয়ার আলম।
উদ্যানটিতে গত ২৫ আগস্ট সন্ধ্যা ছয়টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, চার তরুণ গাঁজা বিক্রি করছেন। বিভিন্ন বয়সী মানুষ তাঁদের কাছ থেকে গাঁজা কিনছেন। মোটরসাইকেলে এসেও কয়েকজনকে গাঁজা কিনতে দেখা যায়।
গাঁজা বিক্রি করা তরুণদের একজনের নাম রায়হান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঝেমধ্যে পুলিশ ঝামেলা করে। পরে বড় ভাইয়েরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আর সমস্যা হয় না।’
পুলিশ বলছে, তারা মাদক বন্ধে অভিযান চালায়। তবে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৭ মাসে ১ হাজার ৭০০ জনের মতো আসামি গ্রেপ্তার করেছি। মাদক কারবারিরা আসলে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এগুলো করে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, রাষ্ট্রের সেবা শ্রেণিকেন্দ্রিক। সে কারণে পার্ক দুটি পাশিপাশি হলেও অবস্থা দুই রকমের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রমনা পার্ক যেহেতু মন্ত্রিপাড়ার কাছে, সেখানে সরকারি আমলা বা অভিজাত শ্রেণির আনাগোনা বেশি থাকে। তাই সেদিকে আলাদা মনোযোগ আছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাধারণ ও ছিন্নমূল মানুষের যাতায়াত বেশি। তাঁদের অভিযোগ জানানোর সক্ষমতা বা সুযোগ কম। তাই মনোযোগ কম।
