আকাশে মেঘের আনাগোনা, চারপাশে গাঢ় সবুজের চাদর, আর কানে ভেসে আসা একটানা জলপ্রপাতের গর্জন। শহুরে যান্ত্রিকতার বাইরে পাহাড় আর জলের এমন মিতালি দেখতে চাওয়া ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য পরম আশ্রয়ের নাম রাঙ্গামাটি। পাহাড়ের রানি হিসেবে পরিচিত পার্বত্য জেলাটি কেবল কাপ্তাই হ্রদ আর ঝুলন্ত ব্রিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে গহীন অরণ্য এবং দুর্গম পাহাড়ের বুকে। বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়গুলোতে জেগে ওঠে অসংখ্য নাম জানা-অজানা ঝরনা। সবুজ পাহাড় ভেদ করে নেমে আসা ধবধবে সাদা পানির ধারা যেন ভ্রমণকারীদের নিরন্তর ডেকে চলে, ‘এসো, প্রকৃতির অপার বিস্ময় দেখে যাও।’
রাঙ্গামাটি জেলা পার্বত্য চট্টগ্রামের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে অনন্য রূপ নিয়ে। ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়, উপত্যকা এবং কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি এ অঞ্চলকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রার নান্দনিকতা। এখানকার পাহাড়গুলোর গঠনগত বৈশিষ্ট্য বেশ জটিল ও দুর্গম। অনেক জায়গায় খাড়া পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ছোট ছোট ঝিরিপথ। বর্ষাকালে পাহাড়ি মেঘ যখন এসব উচ্চতায় এসে জমা হয়; তখন পাহাড়ের প্রতিটি খাঁজে প্রাণ ফিরে পায় প্রাকৃতির রূপধারা। বৃষ্টির পানি পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসায় তৈরি হয় শত শত ছোট-বড় ঝরনা ও জলপ্রপাত। পাহাড়ের গহীন নীরবতা ভেঙে নেমে আসা পানির কলতান পুরো বনাঞ্চলকে এক মায়াবী পরিবেশে রূপান্তর করে। রাঙ্গামাটির বুকজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে রূপসী সব ঝরনা। কোনোটিতে পৌঁছানো সহজ, আবার কোনোটি জয়ের জন্য প্রয়োজন অদম্য ট্র্যাকিং স্পিরিট।
ঝুলন্ত রূপের চিরচেনা জলধারা সুবলং ঝরনা
কাপ্তাই হ্রদের বুক চিরে বোট (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) নিয়ে সুবলংয়ের দিকে এগোলেই দূর থেকে চোখে পড়ে বিশালাকার পাহাড়। এই পাহাড়ের গা বেয়েই নেমে এসেছে ঐতিহ্যবাহী সুবলং ঝরনা। বর্ষাকালে যখন এটি পূর্ণ যৌবনা রূপ ধারণ করে; তখন শত শত ফুট ওপর থেকে গড়িয়ে পড়া পানির ফোয়ারা চারপাশ কুয়াশাময় করে তোলে। সুবলংয়ে যাওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও এর সৌন্দর্য কোনো অংশে কম নয়।
প্রকৃতির রহস্যময়ী ধুপপানি ঝরনা
বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের গহীন পাহাড়ে অবস্থিত ধুপপানি ঝরনা। স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘ধুপ’ শব্দের অর্থ সাদা, অর্থাৎ ধুপপানি মানে ‘সাদা পানির ঝরনা’। এই ঝরনায় পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন ও রোমাঞ্চকর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাড়া পাহাড়, ঝিরিপথ ও পিচ্ছিল পাথর পেরিয়ে যখন ধুপপানির সামনে দাঁড়ানো যায়; তখন ক্লান্তি নিমিষেই উবে যায়। শত ফুট উঁচু থেকে সাদা দুধের মতো ফেনিল জলধারা নিচে আছড়ে পড়ে অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা করে। এর বিশেষত্ব হলো, ঝরনার ভেতরের দিকে একটি প্রাকৃতিক গুহা আছে। যেখানে বসে ঝরনার পানির পর্দা দেখা যায়।
নির্জনতার পরম সৌন্দর্য মুপ্পোছড়া ও ন’কাটাছড়া ঝরনা
কাপ্তাই ও বিলাইছড়ির গহীন অরণ্যে লুকিয়ে থাকা মুপ্পোছড়া এবং ন’কাটাছড়া ঝরনা যেন প্রকৃতির নিজস্ব গোপন চিত্রকর্ম। ট্র্যাকিংপ্রেমীদের কাছে এগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশাল পাথুরে দেওয়াল বেয়ে নেমে আসা স্ফটিক স্বচ্ছ পানি এবং চারপাশের ঘন সবুজ বন এদের রূপকে অনন্য করে তুলেছে।
ধুপপানির বোন ‘গাছকাটা ঝরনা’ ও অন্যান্য
বিলাইছড়ি উপজেলায় আছে এমন অনেক নামহীন ও স্থানীয় নামে পরিচিত অসংখ্য ঝরনা। গাছকাটা ঝরনা, শতপাপড়ি ঝরনা কিংবা সাইনপুকুর এলাকার জলপ্রপাতগুলো অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষদের রোমাঞ্চের নতুন রসদ জোগায়। এ ছাড়া রাঙ্গামাটির সাজেকে আছে হাজাছড়া ঝরনা, বাঘাইছড়ির সিজক ঝরনা, লংগদুর শিলাছড়া ঝরনা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি লংগদুর দুর্গম শিলাছড়া ঝরনা ভ্রমণ করে এসেছেন স্থানীয় তরুণদের একটি দল। এই দলের সদস্য তানভীর ইসলাম তার ঝরনা ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বলেন জাগো নিউজকে। তিনি বলেন, ‘দুর্গম সৌন্দর্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের ঝরনাগুলোর মূল আকর্ষণ। তবে এ সম্ভাবনাকে টেকসই পর্যটনে রূপ দিতে নিরাপত্তা ও সুব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।’
লংগদুর শীলাছড়া ঝরনাকে সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পেতে পারে, পিচ্ছিল ঝিরিপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা দড়ি বা রেলিং স্থাপন এবং দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড বসানো প্রয়োজন। জনবসতি কম হওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে অভিজ্ঞ স্থানীয়দের নিবন্ধিত গাইড হিসেবে নিয়োগ দিলে একদিকে তাদের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে পর্যটকরাও নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করতে পারবেন। প্রকৃতি ও পাহাড়ি পরিবেশের ক্ষতি না করে কাঠের বা বাঁশের বিশ্রামাগার এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে। সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন অঞ্চলে অন্তত একটি জরুরি যোগাযোগ বা ফার্স্ট এইড পয়েন্ট স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি।
রাঙ্গামাটির দুর্গম ঝরনাগুলোতে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা কোনো সাধারণ ভ্রমণের মতো নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ অ্যাডভেঞ্চার। বোট জার্নি শেষে শুরু হয় মূল ট্র্যাকিং। কখনো পাহাড়ি পিচ্ছিল পথ, কখনো খাড়া টিলা, আবার কখনো উরু-সমান পানির ঝিরিপথ পেরিয়ে সামনে এগোতে হয়। প্রকৃতির সাথে মুখোমুখি যুদ্ধ জয় করে পাহাড়ি পথে জোঁকের উপদ্রব, হঠাৎ পাহাড়ি ঢল (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) এবং ঘন জঙ্গলের বুনো গন্ধ ভ্রমণের রোমাঞ্চ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
রাঙ্গামাটির ঝরনা দর্শনের ভ্রমণটি কেবল জলপ্রপাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি স্থানীয় পাহাড়ি জনজীবনের সাথে পরিচিত হওয়ারও এক দারুণ সুযোগ। যাত্রাপথে চোখে পড়ে পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরাদের মাচাং ঘর। পাহাড়ি আদিবাসীদের সহজ-সরল জীবনযাত্রা এবং উষ্ণ আতিথেয়তা যে কোনো পর্যটকের মন ছুঁয়ে যায়। দীর্ঘ ট্র্যাকিংয়ের মাঝে পাহাড়ি পাড়ায় একটু জিরিয়ে নেওয়া, পাহাড়ি জুমের তৈরি সুস্বাদু খাবারের স্বাদ নেওয়া ভ্রমণের আনন্দকে দ্বিগুণ করে দেয়।
রাঙ্গামাটির এই দুর্গম ঝরনাগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিনদিন হুমকির মুখে পড়ছে অপরিকল্পিত পর্যটনের কারণে। পর্যটকদের ফেলা প্ল্যাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট এবং প্ল্যাস্টিক বর্জ্য প্রকৃতির এই নির্মল পরিবেশকে দূষিত করছে। এসব ঝরনায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীর নজরদারি আছে। বিশেষ করে ধুপপানি ঝরনা ভ্রমণের ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে নিজেদের পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দিতে হয়। প্রশাসনের সহযোগিতায় এখানে গড়ে উঠেছে প্রশিক্ষিত ট্যুরিস্ট গাইডের একটি দল। বিশেষ করে ধুপপানি, গাছকাটা ও মুপ্পোছড়া ঝরনায় যেতে স্থানীয় গাইডদের সহযোগিতা নিতে হয়। ধুপপানি ঝরনায় যেতে বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের উলুছড়ি নামক এলাকা থেকে হাটার পথ শুরু হয়। আর এখানেই গাইডদের অবস্থান। গাইডরা পর্যটকদের গন্তব্য ধুপপানি ঝরনা পর্যন্ত নিয়ে যান আবার নিয়ে আসেন।jharna
বিলাইছড়ির গাছকাটাছড়া, মুপ্পোছড়া এবং ধুপপানি ঝরনা নিয়ে গড়ে উঠেছে কমিউনিটি বেইজ ইকোট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট কমিটি। ২০২১ সালে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ২১ সদস্যের এ কমিটির মাধ্যমে ৪০ জন গাইড কাজ করেন। পাহাড়ের প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করে ট্যুরিজম প্রসারে কাজ করছেন তারা।
কমিটির সাধারণ সম্পাদক আথুই মারমা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করিনি। কমিটি হওয়ার আগেও এখানে পর্যটকেরা আসছেন। তবে এখানকার প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি যাতে না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকার জন্যই এই গাইড নিয়োগ ও কমিটি গঠন করা হয়। আমরা ১০ জনের একটা পর্যটক দলের জন্য একজন গাইড নিয়োগ করে থাকি। গাইডের জন্য ১ হাজার টাকা ফি নেওয়া হয়। অনেক সময় পর্যটকদের অনুরোধে একজন গাইডের সাথে ১৪-১৫ জন পর্যটকও যেতে পারেন। আমরা চাই বছরের ৩ থেকে ৪ মাস সময়ের জন্য পর্যটকেরা যাতে নিরাপদে ঝরনাগুলো ভ্রমণ করতে পারেন এবং ঝরনার পরিবেশ ও প্রকৃতির যাতে কোনো ক্ষতি না হয়। তবে ঝরনায় যাওয়ার পথে কিছু কিছু পাহাড়ি পথে সিঁড়ি নির্মাণ করা হলে পর্যটকদের যাতায়াতে সুবিধা হতো।’
রাঙ্গামাটির পর্যটনের বিকাশে স্থানীয় ট্যুর অপারেটরদের ভালো ভূমিকা আছে। পাহাড়ের গহীনে লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করতে কাজ করছেন তারা।
স্থানীয় ট্যুর অপারেটর হিমু বাপ্পী বলেন, ‘বর্ষার এই ভরা মৌসুমে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই লেক এবং এর চারপাশের ঝরনাগুলো যেন এক জীবন্ত স্বর্গে পরিণত হয়। রাঙ্গামাটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সুবলং ও ধুপপানিসহ অন্যান্য পাহাড়ি ঝরনাগুলো বৃষ্টির জল পেয়ে প্রবল বেগে গর্জন করতে করতে নিচে আছড়ে পড়ে। দূর থেকে ভেসে আসা ঝরনার সেই জলপতনের শব্দ এবং চারপাশের সতেজ পরিবেশ যে কোনো পর্যটককে মুহূর্তে মুগ্ধ করে তোলে। বোটে চড়ে ঝরনার একদম কাছাকাছি গিয়ে গায়ে হিমশীতল পানির কণা মাখার আনন্দ এই সময়ে অনন্য।
পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সচল হয়ে ওঠা ছোট-বড় অসংখ্য নামহীন পাহাড়ি ঝিরি লেকের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মেঘলা আকাশ, শান্ত জলের ছোঁয়া আর পাহাড়ি উপত্যকার এই রূপ বর্ষাকালেই সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত ও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। তবে এত সম্ভাবনার মাঝেও আমাদের কিছু বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন- হ্রদের দূরবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের জন্য উন্নত ও আধুনিক নৌযান এবং নিরাপত্তার অভাব আছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব এলাকায় যাতায়াত খুব কঠিন। কোনো পর্যটক অসুস্থ বা আহত হলে তাকে উদ্ধার করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
দিনশেষে পাহাড়ের কোলঘেঁষে কাপ্তাই লেকের বুকে বর্ষার জলছাপ যে কোনো ভ্রমণপিপাসুর মনে চিরস্থায়ী স্মৃতির সৃষ্টি করে। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির নিঃশব্দ গম্ভীরতার মাঝে হারিয়ে যাওয়ার জন্য রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ের ঝরনাগুলোর বিকল্প নেই। পাহাড়ের সবুজ আর ঝরনার শুভ্রতার মেলবন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি কতটা উদার ও সুন্দর হতে পারে। দুর্গম পথ পেরিয়ে ঝরনার কাছে পৌঁছানোর পর মুখের ওপর আছড়ে পড়া সেই হিমশীতল জলের ঝাপসা কুয়াশা ভ্রমণকারীর সব কষ্ট এক নিমিষেই দূর করে দেয়। সঠিক সংরক্ষণ, পরিবেশ সচেতনতা এবং পরিকল্পিত পর্যটনের মাধ্যমে রাঙ্গামাটির এই প্রাকৃতিক বিস্ময়গুলো চিরকাল তার অপার সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকবে।
