
সাংবাদিকতা শুধু খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজ নয়, এটি সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা, সমাজের কাছে জবাবদিহির এক অবিচ্ছেদ্য প্রক্রিয়া। গণমাধ্যমের প্রতিটি কলম, প্রতিটি শব্দ সমাজের ওপর ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এই গভীর উপলব্ধি থেকেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্ম। সিলেটে সাংবাদিকতা ঐতিহ্য, সংগ্রাম, ত্যাগ এবং নৈতিকতার সম্মিলন ঘটে সিলেট প্রেসক্লাবকে কেন্দ্র করে। এখানকার সাংবাদিকরা সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথা তুলে ধরেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, আবার গণমানুষের স্বার্থরক্ষায় হয়েছেন অগ্রণী কণ্ঠস্বর।
এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আবার উদ্ভাসিত হয়েছেন একজন সময়সচেতন, দায়িত্বশীল এবং প্রজ্ঞাবান সাংবাদিক—সিলেট প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূর। এ নিয়ে ৭ম বারের মতো তিনি সভাপতি নির্বাচিত হলেন। তিনি শুধু খবর সংগ্রহ ও প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সাংবাদিকতাকে দেখেছেন বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে। সংগঠক হিসেবে তিনি সহকর্মীদের পাশে থেকেছেন, নৈতিক সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখে চলেছেন, আর সম্পাদক হিসেবে চেষ্টা করেছেন ন্যায়নিষ্ঠা, ভারসাম্য ও সত্যের মানদণ্ড অটুট রাখতে। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনুপ্রেরণা, কারণ তার কাজে রয়েছে আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব, আর দায়িত্বের প্রতি অটল নিষ্ঠা। সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর নাম তাই উচ্চারিত হয় গর্ব, আস্থা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে।
আশির দশকের দিকে তিনি যখন সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন সিলেটের সাংবাদিকতার মান, মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল সত্যিই ঈর্ষণীয় উচ্চতায়। প্রশাসনের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সিলেটে এলে তারা শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং প্রকৃত অর্থেই দিকনির্দেশনা ও মতবিনিময়ের জন্য প্রেসক্লাবে গিয়ে মুকতাবিস-উন-নূরের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করতেন।
এটি তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা প্রভাবের কারণে নয়, বরং একজন সৎ, নীতিবান ও প্রজ্ঞাবান সাংবাদিক হিসেবে তাঁর যে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান গড়ে উঠেছিল—তার স্বীকৃতিস্বরূপই প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরাও তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি সাংবাদিকতার মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষায় ছিলেন আপসহীন। সেই সময় প্রেসক্লাব শুধু সাংবাদিকদের আড্ডাস্থল ছিলো না, বরং চিন্তার মুক্ত অঙ্গন, জনস্বার্থ রক্ষার এক বলিষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম।
দুঃখজনকভাবে সময়ের পরিবর্তনে অনেক ক্ষেত্রে সেই মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। এক সময় যে সাংবাদিকদের সামনে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও সম্মান প্রদর্শন করতেন, পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো অনেক সিনিয়র সাংবাদিককেও এসব কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতে হচ্ছে। সাংবাদিকতার নৈতিক উচ্চতা ও আত্মমর্যাদা ক্রমেই কোথাও কোথাও ক্ষীণ হয়েছে—যা পূর্বতন সেই সোনালি দিনের সঙ্গে বেদনাদায়ক তুলনার জন্ম দেয়।
সিলেট অঞ্চলে সাংবাদিকতার শুরু থেকেই দায়িত্বশীল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সমস্যাবলি, জনজীবন, অভিবাসনের ইতিহাস, সামাজিক আন্দোলন—সবকিছুতেই এখানে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট এবং শক্তিশালী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, পাঠকসংস্কৃতি বদলেছে; কিন্তু এই ঐতিহ্য ধরে রাখা সহজ হয়নি।
মুকতাবিস-উন-নূর পেশাগত জীবনে দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তাঁর কাজের কেন্দ্রে ছিল—পেশাদারিত্ব, নৈতিক সাংবাদিকতা,মুক্তচিন্তা ও দায়িত্ববোধ। সম্পাদক হিসেবে তিনি বিষয়বস্তুর গভীরতা, ভাষার শুদ্ধতা এবং পাঠকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সংবাদপত্রকে সমাজের অন্তর্চেতনার প্রতিফলন হিসেবে দেখতে শিখিয়েছেন অনেককেই।
আজকের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভুয়া সংবাদ ও ডিজিটাল বিভ্রান্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্যের বন্যা তৈরি হয়, আর মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে সর্বস্তরে। এর সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ, যা অনেক সময় সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে। পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা, আইনি হয়রানি এবং কর্মপরিবেশের সংকটও সাংবাদিকদের পেশাগত মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—মূলধারার সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি এবং অনৈক্যের সুযোগে কিছু দুবৃত্ত চক্র ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি সাংবাদিকতার মহান পেশাকে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর নানান নামে প্রেসক্লাব ও সংগঠন গড়ে তুলছে। যেখানে পেশাদার সাংবাদিক নেই বললেই চলে। এতে যেমন পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি প্রকৃত ও নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকদের জন্য পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তাই এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দরকার সততা, পেশাদারিত্ব, দৃঢ় নৈতিক অবস্থান এবং সংগঠিত ও সচেতন সাংবাদিক সমাজ।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন—স্বচ্ছতা, নীতিনিষ্ঠা ও পেশাগত ঐক্য। প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে থেকে মুকতাবিস-উন-নূর যদি সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও উন্নয়নমুখী পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, তবে তা সিলেটের সাংবাদিকতার জন্য নতুন অধ্যায় রচনা করবে।
মুকতাবিস-উন-নূর একজন ব্যক্তি হয়েও যেন একটি প্রবাহের নাম—সত্য, দায়িত্ব ও মানবিকতার উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে যদি সিলেটের সাংবাদিক সমাজ সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যায়, তবে স্বাধীন, ন্যায়নিষ্ঠ ও মর্যাদাবান গণমাধ্যম গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে সম্ভব। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর চিন্তা-দর্শন, প্রজ্ঞা ও কর্মপ্রয়াস শুধু সিলেট নয়, বরং বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকেই আরও সমৃদ্ধ করবে, প্রতিষ্ঠা করবে পেশাটির মহত্ত্ব ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে।
সম্প্রতি তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন—এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়; বরং সিলেটের সাংবাদিক সমাজের আস্থা, ভালোবাসা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন। অনেকেরই দৃঢ় বিশ্বাস—তাঁর দূরদর্শী, বলিষ্ঠ ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বে সিলেটের সাংবাদিকতার গৌরবময় অতীত ঐতিহ্য নতুনভাবে জেগে উঠবে।
এই আস্থা এসেছে তাঁর সততা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব এবং দীর্ঘদিনের নিবেদিত সাংবাদিকতা চর্চা থেকে। তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও নৈতিকতা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেবেন—এমন প্রত্যাশা আজ সর্বত্র উচ্চারিত হচ্ছে।
এবং সেই সঙ্গে আরেকটি সুস্পষ্ট আশা—মুকতাবিস-উন-নূরের সৎ, শক্ত ও নিষ্কলুষ নেতৃত্বে সাংবাদিকতার পবিত্র অঙ্গন থেকে অপেশাদারিত্ব, স্বার্থান্বেষী প্রবণতা ও অপসাংবাদিকতার কালো ছায়া সরে যাবে। গণমাধ্যমে ফিরবে স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ ও সত্যের আলো। সিলেটের সাংবাদিকতা আবারও হয়ে উঠবে জনগণের কণ্ঠস্বর, ন্যায় ও নীতির বিশ্বস্ত ভাষ্যকার।