চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সানমিং শহরের একটি পাহাড়ি জনপদ চিয়াননিং কাউন্টি। সেখানে যাওয়ার আগে ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি, চীনের এই দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকা আমাকে এত গভীরভাবে আমার বাংলাদেশের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেবে।
মূলত পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির দৃশ্য দেখতেই চিয়াননিংয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সফর শেষে যখন ফিরলাম, তখন মনে হলো—আমি কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল ঘুরে আসিনি; বরং হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে এসে বহু বছর আগের নিজের শৈশবকেই যেন নতুন করে ছুঁয়ে দেখে এলাম।
চিয়াননিংয়ের দিকে যত এগোচ্ছিলাম, পথের দুপাশের দৃশ্য ততই মন হরণ করছিল। চোখ জুড়ানো সবুজ পাহাড়ের সারি, পাহাড়ি ঢালে ধাপ কেটে বানানো সিঁড়ি আকৃতির ধানের খেত, আর তলদেশ দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানির পাহাড়ি ঝরনা ও নদী। মেঘে ঢাকা পাহাড়ের চূড়াগুলোর নিচে ধানের খেতগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতির বুকে বিশাল এক সবুজ গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। নগরের কোলাহল আর ইট-পাথরের ব্যস্ততা থেকে বহু দূরে এখানের বাতাসও নির্মল, শান্ত আর সতেজ।
তবে চিয়াননিংয়ের মূল সৌন্দর্য শুধু তার রূপময় প্রকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এখানকার মানুষের জীবনযাপনই এর আসল আকর্ষণ। গ্রামের মানুষ নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, কিন্তু সেই ব্যস্ততায় নেই কোনো বাড়তি চাপ বা হুটোপুটি। আধুনিকতার ছোঁয়া এখানে প্রতিটি ঘরে পৌঁছালেও ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ স্নিগ্ধতা ও মানুষের মধ্যকার আন্তরিকতা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হয়নি।
এই সফরের সবচেয়ে হৃদয়ে দাগ কাটা ঘটনাটি ঘটেছিল একটি বিশাল ধানখেতে। সময়টা ছিল ধান রোপণের ভরা মৌসুম। খেতের কাদাপানির মধ্যে এক কৃষক একা হাতে ধানের চারা রোপণ করছিলেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার নিপুণ হাতের কাজ দেখলাম। তারপর সাহস করে এগিয়ে গেলাম। আমার চীনা ভাষার দৌড় খুব বেশি নয়, তাই প্রাঞ্জলভাবে কথা বলা সম্ভব ছিল না। ধানের চারাগুলোর দিকে আঙুল নির্দেশ করে নিজের বুক দেখিয়ে ভাঙা ভাঙা চাইনিজে বললাম, “ওয়া শিয়াং চিয়ারু, খই মা?”—অর্থাৎ, আমি কি আপনার সঙ্গে ধান রোপণে যোগ দিতে পারি?
কৃষকটি মুখ তুলে তাকালেন। তার মুখে ফুটে উঠল একপ্রস্থ অকৃত্রিম উষ্ণ হাসি। বললেন, “হুআনইং নি ওয়াইগুঅ ফাংইয়”—স্বাগতম, আমার বিদেশি বন্ধু! কোনো প্রকার দ্বিধা না রেখে পরম মমতায় আমার হাতে তুলে দিলেন একগুচ্ছ সতেজ ধানের চারা। জুতোজোড়া খুলে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে নেমে পড়লাম ধানখেতের কাদাপানিতে।
পায়ের নিচে নরম কাদা, হাঁটু সমান পানি, এক হাতে ধানের মুঠো আর অন্য হাতে চারা নিয়ে একটি একটি করে মাটিতে পুঁততে শুরু করলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে হাত-পা কাদায় মেখে একাকার, শরীর ঘামে ভিজে সিক্ত। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এতটুকু ক্লান্তি বা অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল না। বরং এক স্বর্গীয় অনুভূতি আমায় আচ্ছন্ন করে ফেলল। মনে হতে লাগল, আমি চীনের চিয়াননিংয়ে নেই; আমি ফিরে গেছি বাংলাদেশের সেই চেনা গ্রামের ধানখেতে, যেখানে আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল।
শৈশবে নিজ পরিবারকে কৃষিকাজে সাহায্য করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল। তাই চিয়াননিংয়ের কাদামাটির স্পর্শে বহুদিনের পুরনো স্মৃতিগুলো এক নিমেষে জীবন্ত হয়ে উঠল। কাদাপানির সুপরিচিত অনুভূতি আর ধানের চারার সেই মাতাল করা গন্ধ—সবই তো আমার অতি চেনা! হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতি সত্ত্বেও সেদিন গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম, মাটির আসলে কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা দেশ হয় না। ভাষা আলাদা হলেও কৃষকের ঘাম, শ্রম আর মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টানে কোনো তফাত নেই।
আমি যখন সেই কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে চারা রোপণ করছিলাম, একে একে আশপাশের খেত ও বাড়ি থেকে আরও কয়েকজন গ্রামবাসী সেখানে এসে মাঠে নামলেন। কেউ কোনো পারিশ্রমিক বা চুক্তির কথা বললেন না। পরম উৎসাহে সবাই নিজেদের কাজ মনে করে ধান রোপণে হাত লাগালেন।
দেখতে দেখতে পুরো মাঠের দৃশ্যপট বদলে গেল। একা এক কৃষকের নীরব সংগ্রাম মুহূর্তের মধ্যে রূপান্তরিত হলো এক বিশাল সামাজিক উৎসবে। পানিতে নেমে সবাই যেন একই সুষম ছন্দে ধানের চারা পুঁতে চলেছেন—কেউ ডানপাশে, কেউ বাঁপাশে, কেউবা সামনের সারিতে। মুখে আনুষ্ঠানিক কথার আদান-প্রদান নেই, কিন্তু সম্মিলিত কাজের ভেতরেই গড়ে উঠেছে গভীর এক প্রীতি ও সমঝোতা। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে প্রাণখোলা হাসির রোল, যা পাহাড়ি বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।
দৃশ্যটি দেখে এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় ছেয়ে গেল মন। কৌতূহল সামলাতে না পেরে ভাঙা চীনা ভাষায় কৃষককে জিজ্ঞেস করলাম, “ইথিয়ান ইয়াও গেই থামেন তওসাও ছিয়ান?”—অর্থাৎ, কাজের জন্য তাদের দৈনিক পারিশ্রমিক কত দিতে হবে? কৃষক স্মিত হেসে মাথা নেড়ে বললেন, “পু”—না, কোনো টাকা দিতে হবে না।
আমি বেশ অবাক হলাম। পারিশ্রমিক ছাড়া মানুষ কেন এত খাটাখাটুনি করছে? তিনি খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন, প্রতিবেশীরা তাকে সাহায্য করতে এসেছেন। আবার যখন অন্যদের জমিতে চারা রোপণ বা ফসল কাটার সময় আসবে, তিনিও সমানভাবে তাদের জমিতে গিয়ে শ্রম দেবেন। এটাই চিয়াননিংয়ের শত বছরের গ্রামীণ রীতি।
কৃষকের এই সরল উত্তরটি আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমরা আধুনিক শহরের মানুষ শ্রমের প্রতিটি মিনিটকে টাকায় পরিমাপ করি। কিন্তু এই প্রত্যন্ত গ্রামে দেখলাম, পারস্পরিক সংহতি ও সাহায্যই সবচেয়ে বড় সম্বল। কোনো লিখিত চুক্তি নেই, হিসাবের খাতা নেই—আছে কেবল পরস্পরের প্রতি অকৃত্রিম আস্থা। এই দৃশ্য আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল আমাদের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ গ্রামে। আমাদের দেশেও একসময় ‘গাংটা’ বা ‘হাশলা’ কিংবা পারস্পরিক সহযোগিতার এমন চমৎকার প্রথা চালু ছিল, যেখানে ঘর তোলা, ধান কাটা বা যেকোনো সামাজিক আয়োজনে পুরো গ্রামবাসী একসঙ্গে এসে কাজ করত। চিয়াননিংয়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করলাম, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের গ্রামীণ সমাজের শিকড়গুলো মূলত একই সূত্রে গাঁথা।
চিয়াননিংয়ের মানুষ কেবল একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল তা নয়, প্রকৃতির প্রতিও তাদের দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গভীর। পাহাড়ি ঝরনা ও নদীর বিশুদ্ধ পানিকে তারা সতর্কতার সঙ্গে কৃষি ও পানের কাজে ব্যবহার করেন। আশপাশের বনাঞ্চল সংরক্ষণকে তারা নিজেদের অস্তিত্বের অংশ মনে করেন। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানেন—প্রকৃতি বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে গ্রাম বাঁচবে।
তবে চিয়াননিং কেবল ঐতিহ্য আঁকড়ে বসে থাকা কোনো অনগ্রসর গ্রাম নয়। গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানোর ক্ষেত্রে এই অঞ্চল এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এখানে চালু করা হয়েছে ‘শেয়ার্ড ফার্মিং’ বা ফলগাছ দত্তক নেওয়ার মতো অভিনব ব্যবস্থা।
উদ্যোগটি বেশ চমকপ্রদ। শহরের যেকোনো নাগরিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চিয়াননিংয়ের যেকোনো একটি সুনির্দিষ্ট ফলগাছ দত্তক নিতে পারেন। গ্রাহক চাইলে অনলাইনে ছবি ও ভিডিও দেখে কিংবা সরাসরি বাগানে গিয়ে নিজের পছন্দের গাছটি বেছে নেন। তারপর অ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত সেই গাছের বেড়ে ওঠা, ফুল ফোটা এবং ফল ধরার প্রতি মুহূর্তের আপডেট দেখতে পান।
অবশেষে যখন ফল পরিপক্ক হয়, তখন তা প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ করে ডাকযোগে গ্রাহকের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে শহরে বসেও একজন মানুষ একটি নির্দিষ্ট গাছের সঙ্গে আবেগীয় বন্ধন তৈরি করতে পারছেন এবং নিজের খামারজাত পণ্যের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন। অন্যদিকে, স্থানীয় কৃষকরাও কেবল কৃষিপণ্য বিক্রি করে নয়, বরং কৃষি-পর্যটন ও ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে বাড়তি আয়ের পথ পাচ্ছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখছে।
চিয়াননিং কাউন্টির কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ আরও বিস্ময়কর। এটি সমগ্র চীনের অন্যতম প্রধান হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। পুরো চীনে জাতীয়ভাবে যে ধানের বীজ ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় ১০ শতাংশই সরবরাহ করা হয় এই চিয়াননিং কাউন্টি থেকে।
ধানখেতে কৃষকের হাতে যেমন কাদামাটির ছোঁয়া রয়েছে, তেমনি তাদের পকেটে রয়েছে স্মার্ট প্রযুক্তি। চিয়াননিংয়ের কৃষকরা ব্যাপকভাবে ‘লিয়াংশেংপাও’ নামে একটি বিশেষায়িত কৃষি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করেন। এই একটি অ্যাপের মাধ্যমেই কৃষকেরা তাদের বীজের অর্ডার পরিচালনা, আধুনিক কৃষিযন্ত্র (যেমন ড্রোন বা ট্রাক্টর) বুকিং এবং আবহাওয়া ও মাটির আর্দ্রতা সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য পান। বর্তমানে চিয়াননিংয়ের প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ‘মু’ (প্রায় ১০ হাজার ৭৩৩ হেক্টরেরও বেশি) বীজ উৎপাদনের জমি এবং ২৪ হাজারের বেশি কৃষক এই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় এসে তাদের উৎপাদন বহুগুণে বাড়িয়ে নিয়েছেন।
সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিজিটালাইজেশন বলতে আমরা বড় শহর, আধুনিক অফিস বা শিল্পকারখানা বুঝে থাকি। কিন্তু চিয়াননিং প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তির আলো একদম প্রত্যন্ত প্রান্তিক কৃষকের ধানখেতেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এখানে প্রযুক্তি কৃষককে স্থানচ্যুত করেনি, বরং কৃষকের হাতকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করেছে। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা চিয়াননিংয়ের মূল সাফল্য এখানেই। এখানে আধুনিকতা এসেছে, কিন্তু শিকড় উপড়ে ফেলেনি। কৃষি আধুনিক ও যান্ত্রিক হয়েছে, কিন্তু কৃষকের আত্মপরিচয় মলিন হয়নি। এআই এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু প্রকৃতি বা মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিক বন্ধনকে তা ধ্বংস করেনি।
চিয়াননিং থেকে ফেরার পথে গাড়ি যতই এগোচ্ছিল, মন পড়ে রইল সেই কাদা-পানিতে ভরা ধানখেতটিতে। চোখের সামনে ভাসছিল সেই কৃষকের প্রাণখোলা হাসি, তার দেওয়া ধানের গুচ্ছ, কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ করার অদ্ভুত আনন্দ এবং একের পর এক গ্রামবাসীদের মাঠে নেমে আসার সেই যৌথ সৌন্দর্য।
