ফসলহানির পর মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, প্রণোদনা চান ক্ষতিগ্রস্তরা

‎হাওরের অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল। এবার ঘরে বোরো ধান ওঠেনি তাদের। ভারি বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষিজমি অনাবাদি রয়েছে। এর মধ্যেই প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকারে এক মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে হাওরপারের মানুষের।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, ফসলহানির শিকার হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞাকে কঠিন বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন তারা। মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ জরুরি হলেও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা তাদের জীবনে নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে।

‎প্রজনন মৌসুমে দেশি মাছের উৎপাদন বাড়াতে ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে নির্ধারিত সময়ের জন্য সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। তবে এ সিদ্ধান্তে উপজেলার শতাধিক জেলে পরিবার চরম বিপাকে পড়েছে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তাদের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি কোনো সহায়তা না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।

‎উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ মে থেকে আগামী ২৮ জুন পর্যন্ত দেশের সাত জেলায় মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। সে হিসেবে জামালগঞ্জ উপজেলার সব হাওর ও নদীতেও মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ সময় মাছ ধরা, পরিবহন ও বিপণন বন্ধ রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। তবে মাছ ধরাই যাদের একমাত্র জীবিকার উৎস, সেসব জেলে পরিবার সংকটে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। নিষেধাজ্ঞার এই এক মাস কিভাবে কাটবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

‎উপজেলা সমবায় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জামালগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে হালনাগাদ তালিকাভুক্ত মৎস্য সমবায় সমিতি ৬৫টি। এসব সমিতিতে কার্ডধারী মৎস্যজীবী রয়েছেন ৯ হাজার ৪১১ জন, যারা সরাসরি মাছ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। এমনিতেই হাওরে ফসলহানির কারণে চলতি বছর অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে। তার ওপর মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা তাদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে।

‎বেহেলী ইউনিয়নের মৎস্যজীবী মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা সারা বছর হাওর আর নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাই। দিন আনি দিন খাই। একদিন মাছ ধরতে না পারলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এখন এক মাস মাছ ধরা বন্ধ। এই সময় সরকার কোনো সহায়তা না দিলে আমরা পরিবার নিয়ে কিভাবে চলব।’

‎উত্তর ইউনিয়নের জেলে জ্যোতিলাল দাস বলেন, ‘এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। আমার পরিবারে ১১ জন সদস্য। এই পেশার ওপর নির্ভর করেই সারা বছর চলি। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন খুব কষ্টে আছি।’

‎এদিকে উপজেলার সচেতন মহল মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও জেলে পরিবারের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের ভাষ্য, মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি এই সময় কর্মহীন হয়ে পড়া জেলেদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন।

‎হাওর ও নদীতীরবর্তী একাধিক জেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। তারা বলেন, মাছ রক্ষার উদ্যোগ অবশ্যই সফল হোক। কিন্তু সেই উদ্যোগের পুরো ভার যেন শুধু জেলেদের কাঁধে না পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।

‎জামালগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস ইবনে রহিম বলেন, নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে জেলেরাই এর সুফল ভোগ করবেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। প্রণোদনা এলে জেলেরা অবশ্যই পাবেন।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন