সিলেটের গোলাপগঞ্জে বসতবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রবাসী শরীফ উদ্দিনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরের পর ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের দিন বাদী মান্না আহমদের দেওয়া বক্তব্য এবং কয়েকদিন পর আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহারে আগুন লাগার ঘটনা ও আসামিদের ভূমিকার বর্ণনায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৭ আগস্ট ভোর সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার ৯নং পশ্চিম আমুড়া ইউনিয়নের ধারাবহর গ্রামের আব্দুল হকের ছেলে মান্না আহমদের বসতবাড়িতে আগুন লাগে। আগুনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় গোলাপগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে তারা অগ্নিকাণ্ডের খবর পায়। এক মিনিট পর ৬টা ৫৮ মিনিটে স্টেশন থেকে রওনা হয়ে সকাল ৭টা ৫ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। পরে সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সকাল ৮টা ২০ মিনিটে সম্পূর্ণভাবে আগুন নেভানো হয়।
অগ্নিকাণ্ডের দিন বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে মান্না আহমদ জানান, তিনি ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। এ সময় এক প্রতিবেশী তার ঘরে আগুন দেখতে পেয়ে তাকে ডেকে তোলেন। ঘুম থেকে উঠে তিনি ঘরের পাশে আগুন দেখতে পান।
তখন আগুন কেউ লাগিয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি। এমনকি কাউকে আগুন লাগাতে দেখেছেন কিংবা কীভাবে আগুন লাগানো হয়েছে,এমন কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনাও দেননি। বরং তিনি ধারণা করে বলেছিলেন, হয়তো কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে থাকতে পারে।
এরপর গত ২৪ আগস্ট আদালতে মামলা দায়ের করেন মান্না আহমদ। মামলায় লেকভিউ গার্ডেন সিটি এগ্রো রিসোর্ট লিমিটেডের পরিচালক ও প্রবাসী শরীফ উদ্দিনকে প্রধান আসামি করা হয়। মামলায় মোট ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ঘটনার দিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আসামিরা দুটি নোহা গাড়িতে করে মান্না আহমদের বাড়ির সামনে যান। পরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা বাড়িতে প্রবেশ করেন। এজাহারে কয়েকজন আসামি ঘরের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল জাতীয় দাহ্য পদার্থ ঢেলে দেন এবং অন্যরা গ্যাস লাইট দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে কে ঘরের কোন অংশে দাহ্য পদার্থ ঢেলেছেন, কারা আগুন ধরিয়েছেন এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে কারা পাউডার ছুড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ মামলার এজাহারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ভূমিকার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
আর এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন ঘটনার সময় যদি বাদী ঘুমিয়ে থাকেন এবং আগুন লাগার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট পদ্ধতির কথা না বলে থাকেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে আসামিদের প্রত্যেকের এমন বিস্তারিত ভূমিকার তথ্য কীভাবে এজাহারে এলো?
অগ্নিকাণ্ডের খবর মান্না আহমদের পরিবারকে দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শী ফয়েজ আহমদ বলেন, তিনি ফজরের নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরছিলেন। এ সময় হঠাৎ মান্না আহমদের ঘরে আগুন দেখতে পান। পরে দ্রুত গিয়ে মান্নাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন।
এজাহারে উল্লেখ করা দুটি নোহা গাড়ি ও লোকজনের উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে ফয়েজ আহমদ বলেন, তিনি যখন আগুন দেখতে পান তখন সেখানে কোনো নোহা গাড়ি বা কোনো ব্যক্তিকে দেখেননি।
অপর প্রত্যক্ষদর্শী ব্রিটিশ আইডিয়াল স্কুলের নাইট গার্ড বিজয় দাসও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানান, ফয়েজ আহমদের ডাকাডাকি শুনে স্কুল থেকে বের হয়ে মান্না আহমদের বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখেন। কিন্তু ওই সময় কোনো নোহা গাড়ি বা লোকজনকে তিনি দেখতে পাননি।
গোলাপগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আকরামুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার আট মিনিটের মধ্যে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে বসতঘরের মাঝখানের চার-পাঁচটি কক্ষ আগুনে পুড়ে যেতে দেখেন। তবে ঘরের সামনের ও পেছনের অংশ অক্ষত ছিল।
আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আবেদন করলে তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা যেতে পারে।
মামলার বিষয়ে মান্না আহমদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আদালতে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়িতে আগুন লোকজন লাগিয়েছে। আপনি সরাসরি আসেন, আপনাকে এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিবো।’
অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আগুন লাগার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ওয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে কথা বলবো।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। তবে সংবাদ প্রকাশের আগ পর্যন্ত তিনি আর যোগাযোগ করেননি।
আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহারে মান্না আহমদ অভিযোগ করেছেন, তিনি থানায় মামলা করতে গেলে তা নেওয়া হয়নি।
তবে এ বিষয়ে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: ছবেদ আলী বলেন, ‘থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর আমি প্রাথমিকভাবে একজন অফিসার দিয়ে অনুসন্ধান করাচ্ছিলাম। আমার অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগেই মান্না আহমদ আদালত থেকে ট্রিট ফর এফায়ার নিয়ে আসেন। আদালতের ট্রিট ফর এফায়ারের ভিত্তিতে আমি মামলা রুজু করেছি।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, মান্না আহমদ বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ঋণগ্রস্ত। অগ্নিকাণ্ডের পর তিনি ৯নং পশ্চিম আমুড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ব্যাংক ঋণের বিষয় উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ততার একটি সনদপত্র নিয়েছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ হাছিন আহমদ মিন্টুও নিশ্চিত করেছেন।
মামলার প্রধান আসামি প্রবাসী শরীফ উদ্দিন ‘লেকভিউ গার্ডেন সিটি এগ্রো রিসোর্ট লিমিটেড’-এর পরিচালক। মামলার অন্য আসামিরাও তার প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।
প্রকল্পটি চালুর পর থেকেই শরীফ উদ্দিনের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী মহলের বিরোধ চলে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধের জেরে তাকে বিভিন্ন মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলে এর আগে গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন শরীফ উদ্দিন। এ ছাড়া ওই মহলের বিরুদ্ধে গোলাপগঞ্জ প্রেসক্লাবেও সংবাদ সম্মেলন করেছেন তিনি।
এদিকে মামলার ব্যাপারে প্রবাসী শরিফ উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,আমি এই অগ্নিকাণ্ডের বিষয় টি শুনে অতন্ত্য মর্মাহত মান্না আহমদ এর বাড়ি আমার প্রজেক্ট এর পাশে আগুন লাগার বিষয় আমি কিছু জানি না, তবে মান্না আহমদ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন আমাকে প্রধান আসামী করে এবং আমার প্রজেক্টে যারা কাজ করেন তাদের কেও কিন্তু এজাহার তিনি যা বলেছেন আমি তা শুনে হতবাক। অগ্নিকাণ্ডের দিন মান্না আহমদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেছেন কাউকে দেখেন নি বা কোন ব্যাক্তির নাম ও উল্লেখ করেন নি এখন তিনি আমার নামে মামলা দায়ের করেন এটা অতন্ত্য দুঃখের বিষয় আমিও চাই এটা সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সবকিছু সামনে আসুক।
একদিকে অগ্নিকাণ্ডের দিন বাদীর প্রাথমিক বক্তব্য, অন্যদিকে সাত দিন পর আদালতে দেওয়া এজাহারে আগুন লাগানোর পদ্ধতি ও আসামিদের প্রত্যেকের কথিত ভূমিকার বিস্তারিত বর্ণনা। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে নোহা গাড়ি বা লোকজনের উপস্থিতির বিষয়টি না মেলা এবং প্রধান আসামি শরীফ উদ্দিনের সঙ্গে পূর্ববিরোধের অভিযোগ, সব মিলিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে অগ্নিকাণ্ডটি কীভাবে ঘটেছে, এটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ এবং মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কেউ সত্যিই জড়িত কি না এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
