হাওরে বাঁধ ভেঙে আরও পাকা ধান ডুবছে

‘আমার ১৭ কেয়ার (প্রায় ছয় একর) জমির পাকা ধান কাটার জন্য শ্রমিকসহ হাওরে গিয়েছিলাম। দেখতে দেখতে হাওর পানিতে টইটম্বুর হয়ে গেছে। এখানে বাঁধের কাজে অনিয়ম হয়েছে। এ জন্যই এমন সর্বনাশ! আমরা দোষীদের বিচার চাই।’ মধ্যনগরের মুরাদ আহমদ বিষণ্ন মনে ভাঙা বাঁধের পাশে বসে এসব কথা বলছিলেন।

একটু দূরে দাঁড়ানো আরেক কিষানি চিৎকার দিয়ে বলছিলেন, ‘বাঁধের কাজ যখন হয়, তখন ভালো করে কাজ করেনি, বাঁশ-বস্তাও দেয়নি। বাঁধ ভেঙে সবকিছু ডুবে যাচ্ছে।’

সুনামগঞ্জের হাওরের কৃষকরা পড়েছেন নতুন সংকটে। যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকা জমির কোমর থেকে বুকপানি ঠেলে গেল সপ্তাহ ধরে পচা ধান তুলছিলেন তারা। এখন ভাঙা শুরু হয়েছে বাঁধ। গত মঙ্গলবার থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত কেবল মধ্যনগর উপজেলায় ভেঙেছে চারটি বাঁধ। ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলের ধাক্কা সামলাতে পারছে না অসময়ে হওয়া দুর্বল বাঁধ।

গতকাল শনিবার মধ্যনগর জামে মসজিদের পাশের বাঁধ ভেঙে বোয়ালা হাওরের ফসল ডুবে গেছে। এর আগে শুক্রবার ভেঙেছিল শালদিঘা হাওরের বাঁধ। একই উপজেলায় গত মঙ্গলবারও দুটি বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। এসব বাঁধ ভাঙা নিয়ে খামখেয়ালি বক্তব্য আছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের। কৃষক ও স্থানীয় রাজনীতিকরা জানিয়েছেন, এসব বাঁধে নির্মাণকাজে অনিয়ম হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বললেন, ‘হাওরে ফসল কাটা শেষ হয়ে যাওয়ায় বোয়ালা হাওরের বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে।’ পরক্ষণেই বললেন, ‘ধান কাটাও শেষ, বাঁধও ভেঙেছে।’ অন্যদিকে, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘বাঁধ ভাঙায় মধ্যনগরের বোয়ালা হাওরে ২০০ হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে।’ অর্থাৎ, দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে দুই ধরনের তথ্য। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দেয় কৃষকের মাঝে।

স্থানীয়রা জানান, গতকাল শনিবার ভোররাতে গুড়াডুবা উপপ্রকল্পের বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের বোয়ালা হাওরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। শুক্রবার কাইলানী উপপ্রকল্পের বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের শালদিঘা হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। গত মঙ্গলবার জামগড়া খালের বাঁধ ভেঙে ইকরাছইর হাওর এবং বুধবার বাঁধ ভেঙে জিনারিয়া হাওর তলিয়ে যায়।

হুমকিতে আরও বাঁধ
আরও কিছু বাঁধ হুমকিতে পড়েছে। এর মধ্যে মধ্যনগরের রুইবিল হাওরের চারটি পয়েন্ট ঝুঁকিতে রয়েছে। জগন্নাথপুরের নলজুর নদীর পানি বাড়ায় নলুয়ার হাওরের কিছু বাঁধ ঝুঁকিতে পড়েছে। নলুয়ার হাওরের বেতাউকা এলাকার ফসল রক্ষা বাঁধ ধসে মাটি সরে যাওয়ায় ঝুঁকি দেখা দেয়। এই হাওরের ২৫ নম্বর প্রকল্পে ধস দেখা দেয়। একই অবস্থা ২৮ নম্বর প্রকল্পেও। জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের বাঁধগুলোতে কাজে অনিয়ম হয়েছে। তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরের আলমখালী বাঁধটিও ঝুঁকিতে রয়েছে।

হাওরপারের গ্রামগুলোতে কৃষকের দুর্দিন
তাহিরপুর উপজেলা সদরের ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক রেবেন্টু রায়। শনির হাওরে তিনি এ বছর ১৩ কিয়ার জমি চাষাবাদ করেছিলেন। পানিতে নেমে ধান কাটতে কাটতে তাঁর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে শরীরে খিঁচুনি শুরু করে। হাসপাতালে তিন দিন চিকিৎসা নিয়ে এসে দেখেন অর্ধেকেরও বেশি ধানে চারা গজিয়ে গেছে। ধানের এ অবস্থা দেখে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এমন দুর্দশা হাওরপারের হাজারো কৃষকের। তাহিরপুরের মহালিয়া হাওরের সুলেমানপুর গ্রামের কৃষক হাবুল মিয়া বলেন, হাওরের ৩০ ভাগ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধানে চারা গজাচ্ছে।

মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরে চাপা কান্না
পচা খড়-চিটার গন্ধে ভারি হয়ে উঠেছে মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওর। হাওরটি যেন বোরো ধানের ভাগাড়। শোনা যায় ফসলহারা বোরোচাষির চাপা কান্না। গতকাল শনিবার বুকসমান পানিতে নেমে তলা থেকে গোছা গোছা ধান কেটে তুলছিলেন সদর উপজেলার বিরাইমাবাদ গ্রামের বর্গাচাষি জয়নাল মিয়া ও আব্দুল মালিক। তারা জানান, ‘ধান পইচা গেছে জানি। পচা খড় খালি, ছড়া তো নাই। ধরলে মরা গাছ উইট্টা আসে। তা-ও কাটতাছি। মনে মানে না। মনেরে বুঝাই ধান পাকছে, ধান কাটি।’

কিশোরগঞ্জে ধানে গজাচ্ছে চারা
গত শুক্রবার বিকেলে থেকে নতুন করে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক জমি। এ নিয়ে কিশোরগঞ্জের হাওরে মোট ছয় হাজার ৭৬৮ হেক্টর পাকা ধান তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৫ হাজারের বেশি কৃষক। গতকাল শনিবার ভোর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হয়। কৃষকরা হাওরে নামতে পারছেন না। অধিকাংশ ধানের খলা (আঙিনা) ধানসহ পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ধানে চারা গজিয়ে পচা গন্ধ আসছে। শনিবার বিকেল পর্যন্ত মোট ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমি তলিয়ে যাওয়ার হিসাব রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইটনা উপজেলা।

নেত্রকোনায় কৃষকের চোখেমুখে বিষাদের ছায়া
নেত্রকোনায় কৃষকের চোখেমুখে এখন বিষাদের ছায়া। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর ও সমতলের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। নেত্রকোনায় ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ধান ডুবেছে। হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দার পাশাপাশি, পূর্বধলা, আটপাড়া, বারহাট্টা, কেন্দুয়া ও নেত্রকোনা সদরের উঠতি বোরো ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন