সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভরাম হাওরে অতিবৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া বোরো ধান পানির নিচ থেকে ভেসে উঠতেই শুরু হয়েছে এক নতুন দুঃস্বপ্ন। দিনের আলোতেই নৌকা নিয়ে হাওরে ঢুকে কৃষকের জমির ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে একদল দুর্বৃত্ত। অসহায় কৃষকরা বাধা দিতে গেলে উল্টো হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একের পর এক জমিতে ধান লুটের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকটি নৌকায় করে একদল ব্যক্তি কাদিরপুর ও ধল আমিরপুর এলাকার বিভিন্ন জমিতে প্রবেশ করে প্রকাশ্যে ধান কাটতে শুরু করে। খবর পেয়ে জমির মালিকরা ঘটনাস্থলে গেলে অভিযুক্তরা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভাঙ্গাডহর গ্রামের কৃষক চপল মজুমদার, সুখময় দাসসহ একাধিক ভুক্তভোগী জানান, অনেক কষ্টে ফলানো ধান অতিবৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিনের রোদে পানি কমে ধান ভেসে উঠতেই দুর্বৃত্তরা সুযোগ নেয়। তারা নৌকাযোগে এসে জমির ধান কেটে নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, তারা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে বিষয়টি প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করেছেন। পরে সেই ভিডিও স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দেখানো হলে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়।
আলী আহমদ নামে এক ব্যক্তি জানান, ভাঙ্গাডহর গ্রামের কয়েকজন কৃষক তাকে ফোন করে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন এবং ভিডিও পাঠান। তিনি বলেন, “ভিডিও দেখে ধল আমিরপুর এলাকার অন্তত একজনকে শনাক্ত করা গেছে।”
এর আগেও উপজেলার ভাঙ্গাডহর ও ডাইয়ারগাঁও এলাকায় একই ধরনের ধান লুটের ঘটনা ঘটে। সে সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অভিযুক্তরা দ্রুত নৌকা নিয়ে পালিয়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানান।
তাড়ল ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য বাবুল দাস বলেন, “হাওরের পানি কমতে শুরু করায় তলিয়ে যাওয়া ধান আবার দৃশ্যমান হয়েছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু লোক নৌকায় করে এসে ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ টহল বাড়ানোর পর কিছুটা কমলেও আতঙ্ক এখনো কাটেনি।”
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারিয়ে তারা এমনিতেই দিশেহারা। তার ওপর যদি লুটপাটের শিকার হতে হয়, তাহলে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। অনেকেই রাত জেগে হাওর পাহারা দিচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী বলেন, “গত মঙ্গলবার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ধান কাটার বিষয়ে সতর্কতা জারি করে। সীমান্ত নির্ধারণ ছাড়া কোনো জমির ধান কাটতে নিষেধ করা হয়েছে। নতুন অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জিব সরকার বলেন, “কৃষকের ফসল লুটের ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।”
এদিকে হাওরে ধান লুটের একের পর এক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে যারা তাদের শেষ সম্বল লুটে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।