- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

হারানো রূপে ফিরছে হাজার বছরের ঐতিহাসিক তীর্থস্থান সিন্দুরমতি

কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ঐতিহাসিক সিন্দুরমতি দিঘি দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে ফিরে পাচ্ছে তার হারানো রূপ। প্রায় ১৫০ কোটি টাকার মেগা সংস্কারকাজে বদলে যাচ্ছে ১৬ দশমিক ৫ একর আয়তনের প্রাচীন এই দিঘি।

খননকাজ শেষ হওয়ার পর বর্তমানে দিঘির পাড় উঁচু করা, চারপাশে ঢালাই পথ নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, আধুনিক স্নানঘাট ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ নির্মাণসহ চলছে নানা উন্নয়নকাজ।

রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের সিন্দুরমতি এলাকা এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়ন সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অবস্থিত সিন্দুরমতি দিঘি। এটি শুধু একটি জলাশয় নয়, হাজার বছরের ইতিহাস, লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।

ভরা মৌসুমেও ইলিশশূন্য পদ্মা, জেলেদের হাহাকার
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, দিঘিটি ৮০০ থেকে ১০০০ বছর আগে খনন করা হয়েছিল। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কা থেকে আগত হিন্দু জমিদার রাজ নারায়ণ চক্রবর্তী প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে বিশাল এই দিঘি খননের উদ্যোগ নেন। কিন্তু খনন শেষ হলেও দিঘিতে পানি না ওঠায় তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন।

লোককথা রয়েছে, এক রাতে জমিদার স্বপ্নাদেশ পান তার আদরের দুই কন্যা ‘সিন্দুর’ ও ‘মতি’কে দিঘির মাঝখানে বসিয়ে পূজা-অর্চনা করতে হবে। সেই অনুযায়ী দিঘির মাঝখানে পূজার আয়োজন করা হয়। পূজার একপর্যায়ে প্রয়োজনীয় উপাচার সংগ্রহ করতে জমিদার দিঘির পাড়ে উঠে আসেন। ঠিক তখনই দিঘির তলদেশ থেকে প্রবল বেগে পানি উঠতে শুরু করে। মুহূর্তেই পানিতে ভরে যায় বিশাল দিঘি। তবে সেই অথৈ জলে তলিয়ে যান জমিদারের দুই কন্যা সিন্দুর ও মতি। তাদের নাম অনুসারেই পরে দিঘিটির নাম হয় ‘সিন্দুরমতি’।

দিঘির চারপাশে রয়েছে প্রাচীন বটবৃক্ষ ও বিভিন্ন দেব-দেবীর মন্দির। রাম মন্দির, কালী মন্দির, শিব মন্দির, দুর্গা মন্দির, রাধা-কৃষ্ণ মন্দির, বিশ্বকর্মা মন্দির, গণেশ মন্দির, ভোলানাথ মন্দির, বুড়ি মন্দির, ইসকন মন্দির ও শ্মশান কালী মন্দিরসহ এখানে রয়েছে একাধিক ধর্মীয় স্থাপনা। মরদেহ সৎকার, প্রতিমা বিসর্জনসহ নানা ধর্মীয় আচারও পালিত হয় এখানে।

প্রতিবছর চৈত্র মাসে সিন্দুরমতি দিঘিকে ঘিরে বসে ঐতিহাসিক ‘সিন্দুরমতি মেলা’। পুণ্যস্নানের আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীরা এখানে আসেন। স্থানীয়দের দাবি, ভারত ও নেপাল থেকেও এই মেলায় মানুষের সমাগম ঘটে।

দীর্ঘদিনের অবহেলা ও পলি জমে দিঘিটি ভরাটের দিকে এগিয়ে গেলেও এখন সেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। দিঘির খননকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পাড় উঁচু করা, চারপাশে সুসজ্জিত ঢালাই পথ তৈরি, সৌন্দর্য বর্ধনে বৃক্ষরোপণ এবং দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে আধুনিক স্নানঘাট ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ নির্মাণের কাজ চলছে।

১৯৭৫ সালে তৎকালীন সরকার দিঘিটি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় খননকালে দিঘির তলদেশ থেকে প্রাচীন মূর্তি ও মূল্যবান মুদ্রা উদ্ধারের কথা জানা যায়। এসব প্রত্নবস্তু বর্তমানে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বর্তমানে চলমান এই বড় সংস্কার প্রকল্পে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ চলছে। এর আওতায় ৪০০ মণ চাল ও ১০০ মণ গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সিন্দুরমতি দিঘির তত্ত্বাবধায়ক তপন কুমার মন্ডল বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রতিনিধিরা এসে দিঘিটিকে ৮০০ থেকে হাজার বছরের পুরোনো বলে জানিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন অযত্নে থাকায় এখানে পূজা ও মেলার আয়োজন কঠিন হয়ে পড়েছিল। দিঘিটি প্রায় ভরাট হওয়ার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এখন সংস্কারের ফলে এটি আবার নিজস্ব রূপ ফিরে পাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হেমন্ত কুমার বর্মন বলেন, হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আবারও ফিরে আসছে। এই দিঘির সঙ্গে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেক আবেগ জড়িয়ে আছে। সংস্কারকাজ শেষ হলে এটি আরও আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠবে।

বয়োজ্যেষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দা শ্রীমতি ফুলঝুরি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এখানে পূজা দিয়ে আসছি। রাম ঠাকুর ও কালী ঠাকুরের পূজা থেকে শুরু করে বহু বছর ধরে এই দিঘির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। এখানকার মেলায় দেশের বাইরের মানুষও আসেন। দিঘিটি সংস্কার হচ্ছে দেখে খুব ভালো লাগছে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘জমিদার ও তার দুই কন্যা সিন্দুর-মতির আত্মত্যাগের ইতিহাস এখানে জড়িয়ে আছে। আমরা চেষ্টা করছি ঐতিহ্যবাহী এই স্থানটিকে এমনভাবে সাজাতে যাতে ভক্তরা নির্বিঘ্নে ও শান্তিতে পূজা-অর্চনা এবং পুণ্যস্নান করতে পারেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর আগাম বৃষ্টির কারণে সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। তবে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পুরোদমে কাজ শুরু করে এটিকে দেশের অন্যতম প্রসিদ্ধ দর্শনীয় স্থানে পরিণত করার চেষ্টা করা হবে।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন