১৮৬২ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে ৫৩.১১ কিলোমিটার ট্রেন চালুর মাধ্যমে এ অঞ্চলে রেলওয়ের সূচনা করেন। দীর্ঘ এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এই রেলপথ কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, বরং পূর্ব বাংলার অর্থনীতি, প্রশাসন ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে। সাশ্রয়ী ভাড়া, তুলনামূলক দ্রুতগতি এবং নিরাপদ ভ্রমণের কারণে একসময় রেলই ছিল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যাতায়াতব্যবস্থা। সে সময় রেল দুর্ঘটনা ছিল খুবই বিরল ঘটনা। বিপরীতে নদীমাতৃক বাংলায় নৌপথে লঞ্চ ও স্টিমার দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটত, বিশেষ করে বর্ষা ও ঝড়ের মৌসুমে। এ কারণে বহু যাত্রী নৌপথের পরিবর্তে রেলপথে ভ্রমণকে বেশি নিরাপদ বলে মনে করতেন।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত বিভাগের ফলে এ অঞ্চলের রেলওয়েও প্রশাসনিক বিভাজনের মধ্যে পড়ে। তৎকালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটি বড় অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্ববঙ্গ অঞ্চলে পড়ে, যার মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এই অংশটি নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে নামে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতে থাকে। স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোয় রেলওয়ে ছিল পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা প্রশাসন, বাণিজ্য ও যাত্রী পরিবহনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের অবসান ঘটে এবং নতুন রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী রেলওয়েকে পুনর্গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর এই রেলওয়ে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে’ নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং আগের অবকাঠামো নিয়েই নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে।
১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের নাম পরিবর্তন করে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে রাখা হয়। এর পরের বছর এই রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ১৯৬২ সালের ৯ জুন জারিকৃত রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী ১৯৬২-৬৩ অর্থবছর থেকে রেলওয়েটি পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়েজ বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হতে থাকে। সে সময় পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে ছিল পাকিস্তান রেলওয়ের দুটি প্রধান বিভাগের একটি এবং ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে রেল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। এই বিভাগের সদর দপ্তর ছিল চট্টগ্রামে, যেখান থেকে সমগ্র পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের অবসান ঘটে এবং নতুন রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী রেলওয়েকে পুনর্গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর এই রেলওয়ে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে’ নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং আগের অবকাঠামো নিয়েই নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে।
চট্টগ্রাম শহর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি ব্রিটিশ শাসকদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। ১৭৬০ সালে চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তারা এখানে প্রশাসনিক ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করতে থাকে। ১৮৭০ সালের আগেই কদমতলী থেকে টাইগারপাস হয়ে পাহাড়তলী পর্যন্ত প্রায় ২০৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। বিস্তীর্ণ এই এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠে অসংখ্য সরকারি স্থাপনা। ১৮৭২ সালে প্রশাসনিক ভবন হিসেবে নির্মিত হয় সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং)। পরে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে প্রতিষ্ঠার পর ১৮৯৩ সালের ১৪ নভেম্বর সরকারি গেজেটের মাধ্যমে সিআরবিসহ প্রায় ১৬০ একর জমি রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সিআরবিকে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
আন্তনগর ট্রেন সংযোজন ছিল এ অঞ্চলের রেল যোগাযোগে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। পাকিস্তান আমলেই ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রথম দ্রুতগতির আন্তনগর ট্রেন চালু হয়, যা সময়নিষ্ঠ ভ্রমণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। ১৯৫৫ সালের ১ মে তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয় ‘গ্রিন অ্যারো’ নামের একটি আধুনিক ট্রেনের। প্রথম শ্রেণির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ ও স্বল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সক্ষমতার কারণে ট্রেনটি অল্প সময়েই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সে সময় এই রুটে শুধু চট্টগ্রাম মেইল ও গ্রিন অ্যারোতেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগি ছিল। রাতে চলত চট্টগ্রাম মেইল এবং দুপুরে চলত দ্রুতগতির গ্রিন অ্যারো।
গ্রিন অ্যারো
‘গ্রিন অ্যারো’ নামটি এতটাই আলোচিত হয়ে ওঠে যে একই নামে ম্যাচ বক্স কোম্পানি খোলা হয়েছিল। এমনকি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির গণিত বইতেও এই ট্রেনের উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছে—ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে কত মাইল অতিক্রম করলে ট্রেনটির গতি কত হবে, এমন অঙ্ক ছাত্রদের সমাধান করতে দেওয়া হতো। এ উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, সমকালীন মানুষের কাছে গ্রিন অ্যারোর পরিচয় ছিল তার দ্রুতগতির জন্য। ভারতীয় উপমহাদেশের রেলব্যবস্থা ব্রিটিশ রেলওয়ের নামকরণ প্রথা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। সে কারণে বহু ট্রেনের নামের শেষে ‘মেইল’, ‘এক্সপ্রেস’, ‘অ্যারো’ ইত্যাদি শব্দ যুক্ত থাকত।
১৯৬৪ সালে ফাতিমা জিন্নাহ রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে এক সফরে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে পথে অসংখ্য মানুষ ট্রেন থামিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানায়। ফলে যে পথ গ্রিন অ্যারো সাধারণত আট ঘণ্টায় অতিক্রম করত, সেই যাত্রাই সেদিন শেষ হতে লেগে যায় প্রায় ৩০ ঘণ্টা।
গ্রিন অ্যারো শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ঢাকা-সিলেট লাইনেও চলাচল করত। ১৯৬১ সালের ইস্ট পাকিস্তান ট্রান্সপোর্টেশন সার্ভের প্রতিবেদনে দেখা যায়, একই দূরত্ব অতিক্রম করতে গ্রিন অ্যারো চট্টগ্রাম মেইলের তুলনায় প্রায় ১৫ মিনিট কম সময় নিত। তবে একবার এই দ্রুতগতির ট্রেনের যাত্রাই হয়ে উঠেছিল ব্যতিক্রমী। ঘটনাটি ১৯৬৪ সালের। সে বছর ফাতিমা জিন্নাহ রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে এক সপ্তাহের সফরে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। তার সফর ঘিরে সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল অভূতপূর্ব। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে পথে অসংখ্য মানুষ ট্রেন থামিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানায়—কোথাও ফুলের মালা, কোথাও স্লোগান, কোথাও আবার ভিড়ের চাপে ট্রেনকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফলে যে পথ গ্রিন অ্যারো সাধারণত আট ঘণ্টায় অতিক্রম করত, সেই যাত্রাই সেদিন শেষ হতে লেগে যায় প্রায় ৩০ ঘণ্টা। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা ও আবেগঘন অভ্যর্থনাই এই দীর্ঘ বিলম্বের প্রধান কারণ ছিল।
দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে তখন আলাদাভাবে ডাইনিং কার সংযুক্ত থাকত, যা যাত্রীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় ছিল। ডাইনিং কারে পরিবেশিত খাবারের মধ্যে রেলওয়ের মাটন কাটলেট বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল, অনেক যাত্রী শুধু ভালো খাবার ও আরামদায়ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতার জন্যই ডাইনিং কারে আসন নেওয়ার চেষ্টা করতেন। তুলনামূলক আরামদায়ক ভ্রমণ ও দ্রুতগতির কারণে ‘গ্রিন অ্যারো’ দীর্ঘদিন পূর্ব পাকিস্তানের আধুনিক রেলযাত্রার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে এই রুটে ‘সমতা’, ‘উর্মি অরুণা’, ‘উর্মি গোধূলী’, ‘মহানগর পূরবী’, ‘ময়নামতী এক্সপ্রেস’, ‘সোনার বাংলা এক্সপ্রেস’, ‘সুবর্ণ এক্সপ্রেস’, ‘তূর্ণা এক্সপ্রেস’, ‘মহানগর প্রভাতী’ এবং ‘মহানগর গোধূলী এক্সপ্রেসে’র মতো আন্তনগর ট্রেন চালু হলেও পূর্ববঙ্গের রেল–ইতিহাসে ‘গ্রিন অ্যারো’র মতো স্বতন্ত্র উপস্থিতির স্বাক্ষর রাখতে পারেনি আর কোনো ট্রেন।
‘গ্রিন অ্যারো’র জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক ছিল যে সমকালীন সাহিত্যেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত কাজী নুরুন্নবীর উপন্যাস ‘মেঘমুক্ত আকাশ’-এ ‘গ্রিন অ্যারো’ ট্রেনের একটি জীবন্ত বর্ণনা পাওয়া যায়। উপন্যাসে লেখা হয়েছে—‘গ্রিন এ্যারো ট্রেন ঢং ঢং করিয়া গাম্ভীর্যপূর্ণ ঘণ্টা বাজাইতে বাজাইতে যখন ঢাকা প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করিয়া থামিয়া গেল তখন ঘড়িতে সকাল সাতটা। যাত্রীদের মধ্যে যাহারা সারা রাত জাগ্রত থাকিয়া এই নির্দিষ্ট স্টেশানটির আগমন প্রতীক্ষায় জানালার মধ্য দিয়া মস্তক বাহির করিয়া চাহিয়া বসিয়াছিল, বিকট যন্ত্র দানবটি কস্ কস্ করিয়া ব্রেক কষিতেই তাহারা হুড় হুড় ধুড় ধুড় করিয়া নামিয়া গেল। মুহূর্তে কুলিদের হৈ-চৈ-এ স্টেশান সরগরম হইয়া উঠিল। ইতিমধ্যে দেখা গেল একটা ছোট দশ বার বছরের কিশোর ‘চাই চা-রুটি এক আনা!’ বলিয়া হাঁক ছাড়িতে ছাড়িতে এক সময় যখন একখানা মধ্যম শ্রেণীর কামরার দ্বারে আসিয়া দাঁড়াইল, তসলিমের তখন নিদ্রা ভঙ্গ হইল। …’ এই বর্ণনা শুধু একটি ট্রেনের আগমন দৃশ্য নয়, বরং তৎকালীন রেলভ্রমণ, স্টেশন–সংস্কৃতি এবং যাত্রীজীবনের এক বাস্তব ও প্রাণবন্ত ছবি তুলে ধরে।
‘গ্রিন অ্যারো’র সামাজিক বাস্তবতাও সাহিত্যিক রচনায় ধরা পড়েছে। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত এ কে এম ফজলুল হকের ‘ঝড়ের কবলে’ গ্রন্থে দেখা যায়, শহর ও গ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চলে কিছু দুষ্টু কিশোর ট্রেন চলার সময় পাথর নিক্ষেপ করত। লেখক নিজেও ট্রেনের যাত্রী ছিলেন এবং একবার ট্রেনে ছোড়া একটি পাথর কামরার গায়ে লেগে ফিরে এসে এক মহিলা যাত্রীর মাথায় আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে রক্তক্ষরণ শুরু হলে যাত্রীরা হতবাক হন। ট্রেনে থাকা ডাক্তার ছলিম সাহেব তার ব্যাগ থেকে তোয়ালে বের করে ভিজিয়ে এনে মহিলার মাথায় চাপ দেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। ট্রেন তখনো পূর্ণ গতিতে চলছিল এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হওয়ায় কেউ চেইন টেনে ট্রেন থামায়নি। লাকসাম জংশন পার হয়ে অনেক দূর যাওয়ার পর ধীরে ধীরে আহত মহিলার জ্ঞান ফিরে আসে। ‘গ্রিন অ্যারো’র পরিচয় শুধু দ্রুতগামী ও আধুনিক ট্রেন হিসেবে ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সে সময়কার মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, সামাজিক আচরণ এবং নানা স্মরণীয় ঘটনা।
তবে সব বর্ণনা সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সরকারি নথিতেও ‘গ্রিন অ্যারো’র অবস্থান স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ইস্ট পাকিস্তান অ্যাসেম্বলি প্রসিডিংস (১৯৬২, ভলিউম-২১, নং-১ এবং ১৯৬৩, ভলিউম-২৪, নং-১) অনুযায়ী, রেলওয়ে বাজেটের আলোচনায় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্য আব্দুল মালেক উকিল স্পিকারকে জানান, গ্রিন অ্যারো প্রায়ই ২-৩ ঘণ্টা দেরি হয়। এ ছাড়া যাত্রীদের জন্য পায়খানা, প্রস্রাব এবং অজুর পানির তীব্র সংকট রয়েছে। গ্রিন অ্যারোর আধুনিকতা এবং দ্রুতগামিতার সঙ্গে যুক্ত ছিল বাস্তবিক অসুবিধা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাও। এরই ধারাবাহিকতায় ’৭১ অব্যবহিত পূর্বের কোনো একটা সময়ে গ্রিন অ্যারোর পথ চলা থেমে যায়।
উল্কা এক্সপ্রেস
১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চালু হয় প্রাতঃকালীন ‘উল্কা এক্সপ্রেস’, যা শুরু হওয়ার আগের দিন ৩১ ডিসেম্বর ১৯৬৫ তারিখে আজাদ, সংবাদ, ইত্তেফাক এবং পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় বড় আকারের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়। হালকা মেরুন রঙের এই ট্রেনটি তখনকার মিটারগেজ লাইনের মধ্যে অন্যতম দ্রুতগামী ট্রেন হিসেবে পরিচিত ছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী রুটে এটি ভৈরববাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কুমিল্লা, লাকসাম এবং ফেনীতে মাত্র ছয়টি সংক্ষিপ্ত স্টপেজে থামত। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী আপ উল্কা চলত ৬ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে, আর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ডাউন উল্কা চলত ৬ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে, যা তখনকার সময়ের জন্য অত্যন্ত দ্রুতগামী মনে করা হতো। ১৯৮৬ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে মহানগর এক্সপ্রেস চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্কা এক্সপ্রেস বন্ধ হয়ে যায়। উল্কার ট্রেন নম্বর ছিল ১৩ আপ ও ১৪ ডাউন। চট্টগ্রাম মেইল চলত ১ আপ ও ১ ডাউন নম্বরে, আর গ্রিন অ্যারোর জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ আপ, ৪ ডাউন এবং ৩এ আপ ও ৪এ ডাউন নম্বর। পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের ১৯৬৯ সালের টাইম টেবিল অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে উল্কা ও গ্রিন অ্যারোর পাশাপাশি চিটাগাং মেইল এবং ঢাকা ফাস্ট প্যাসেঞ্জার নামের আরও দুটি ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত। সে সময় রেলওয়ের টাইম টেবিল বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় প্রকাশিত হতো।
হালকা মেরুন রঙের এই ট্রেনটি তখনকার মিটারগেজ লাইনের মধ্যে অন্যতম দ্রুতগামী ট্রেন হিসেবে পরিচিত ছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী রুটে এটি ভৈরববাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কুমিল্লা, লাকসাম এবং ফেনীতে মাত্র ছয়টি সংক্ষিপ্ত স্টপেজে থামত।
সেকালের রেলের বগিগুলো চার শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল—ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, ইন্টার ক্লাস এবং থার্ড ক্লাস। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ফার্স্ট ও সেকেন্ড ক্লাস বগিতে যাতায়াত করতেন। ইন্টার ক্লাস বগি ছিল সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশার সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য, আর বাকিরা যাতায়াত করতেন থার্ড ক্লাস বগিতে।
ইন্টার ক্লাস এবং থার্ড ক্লাস বগিতে নারীদের জন্য আলাদা বগি থাকত, যার গায়ে লেখা থাকত ‘মহিলা’ এবং উর্দুতে ‘জেনানা’। তাদের পুরুষ সঙ্গীরা তখন পৃথক পুরুষ বগিতে বসত। এই বগিগুলোতে বসার ব্যবস্থা ছিল চার সারি—মুখোমুখি দুই সারি, আর পিঠাপিঠি আরও দুই সারি।
সব বগি সমান আকারের হতো না, কোনো বগি বড়, কোনো বগি অপেক্ষাকৃত ছোট। প্রতিটি বগির ভেতরের দুই পাশের দেয়ালে লেখা থাকত বগির ধারণক্ষমতা—‘১৪ জন বসিবেক’, ‘২৮ জন বসিবেক’ বা ‘৪০ জন বসিবেক’। এই লেখা যাত্রীর জন্য ছিল একটি নির্দেশনা, যাতে কেউ অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বসার চেষ্টা না করে এবং ভ্রমণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।
টিকিট পেতে জনসাধারণ যেন অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির মুখোমুখি না হয়, সে জন্য রেল কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের সচেতন করত। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে একটি বিজ্ঞপ্তি ছিল এরূপ:
‘ইষ্টার্ণ বেঙ্গল রেলওয়ে প্রত্যেক ষ্টেশনে এই রেলওয়ের সমস্ত গন্তব্যস্থানের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক টিকিট প্রদত্ত হইয়াছে। যদি কোনো স্টেশন হইতে আপনাকে টিকিট না দেওয়া হয়, তবে চট্টগ্রামস্থ ই. বি. রেলওয়ের চিফ ট্রাফিক ম্যানেজারের নিকট অবিলম্বে জানান।’
কিন্তু এই বিজ্ঞপ্তি সত্ত্বেও ভোগান্তি পুরোপুরি কমত না। বরং সমকালীন পত্রিকায় এই ধরনের অসংখ্য অভিযোগ প্রকাশ পেত। স্টেশনে এসে টিকিটের জানালা বন্ধ থাকা, পর্যাপ্ত টিকিট না পাওয়া—এসব অভিজ্ঞতার কারণে অনেক যাত্রী শেষ পর্যন্ত বিনা টিকিটে রেলযাত্রা করতে বাধ্য হতেন। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞাপনের ভাষা ক্রমে কঠোর ও উদ্ভাবনী করত। এক বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিল:
‘আপনার টিকিটটা কিনেছেন? রেলওয়ের আয় বাড়াতে সাহায্য করুন। এটা আপনারই নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। আপনি কি জানেন, বিনা টিকিটে গত বছরে সাত লক্ষ যাত্রী ধরা পড়েছে? তাদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ ১৯ লাখ টাকা, আরও অনেক লাখ হয়তো পাওয়া যায়নি। লোককে টিকিট কিনতে সাহায্য করা আপনারও কর্তব্য। —পাকিস্তান ইষ্টার্ণ রেলওয়ে’
অন্যদিকে পাকিস্তান পূর্ব রেলওয়ের প্রকাশিত কিছু বিজ্ঞপ্তির ভাষা ছিল আরও বেশি জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে রচিত। এসব বিজ্ঞপ্তিতে কেবল নিয়ম মানার কথা বলা হতো না, বরং রেলকে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হতো। একটি বিজ্ঞপ্তিতে লেখা হয়েছিল:
‘টিকিটবিহীন ভ্রমণ ও রেলওয়ের সম্পদ অপহরণ পি. ই. আর-এর উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। স্বাধীন জাতি ও স্বাধীন মানুষ অবশ্যই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। পি. ই. আর আপনার দোরগোড়ায় এনে দেয় সমৃদ্ধি।’
এভাবে বিজ্ঞপ্তির শব্দচয়ন ও শৈলী কেবল টিকিট বিক্রয় বৃদ্ধি করত না, বরং মানুষকে রেলযাত্রা ও রেলের সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রতি সচেতন করত।
রেলের অ্যালার্ম চেইন টানা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। তাই যাত্রীদের সতর্ক করার জন্য নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতো। এসব বিজ্ঞপ্তি সাধারণ প্রশাসনিক নির্দেশনা হলেও এর ভাষা, শব্দচয়ন ও সামাজিক উদ্বেগের প্রকাশ আমাদের তৎকালীন সমাজজীবনের একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিজ্ঞপ্তিগুলো সাধারণত পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের ‘চীফ ট্রান্সপোর্টেশন ম্যানেজারে’র বরাতে প্রকাশিত হতো এবং এতে যাত্রীদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার পাশাপাশি সামাজিক শৃঙ্খলার কথাও জোর দিয়ে বলা হতো। ১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তির ভাষা ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও সতর্কতামূলক। সেখানে বলা হয়:
চেইন টানা নিয়ে যাত্রীদের সতর্ক করার জন্য নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হতো। এসব বিজ্ঞপ্তি সাধারণ প্রশাসনিক নির্দেশনা হলেও এর ভাষা, শব্দচয়ন ও সামাজিক উদ্বেগের প্রকাশ আমাদের তৎকালীন সমাজজীবনের একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
‘পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে। অযথা এলার্ম চেইন টানায় শুধু আপনাদের ট্রেনই বিলম্বে পৌঁছুবে না, সারা রাস্তায় আরো অনেক ট্রেনই আটকা পড়ে দেরীতে পৌঁছুবে। আর তাতে—সমস্ত ট্রেনের যাত্রীসাধারণের অশেষ হয়রানি হবে। রোগীরা ঔষধ ও ডাক্তারের নাগালের অভাবে কষ্ট পাবেন, প্রাণও হারাতে পারেন। ছাত্ররা ক্লাস হারাবেন। কর্মচারীরা অফিস পৌঁছুতে পারবেন না। যাত্রীসাধারণের কাজের ক্ষতি হবে। অনেকে পরবর্তী ট্রেন বা অন্য যানবাহন পাবেন না। কত শিশু, বৃদ্ধ ও রোগী খাদ্য পথ্য নিদ্রা অভাবে কষ্ট পাবেন। যারা অযথা নিজের সুবিধার জন্য বে-জায়গায় গাড়ি থামায় তারা স্বার্থপর, অবিবেচক ও সমাজদ্রোহী। তাদের চেইন টানা থেকে নিবৃত্ত করুন এবং ধরিয়ে দিয়ে আইনত বিচারের জন্য সোপর্দ করুন। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে ১লা জানুয়ারী হইতে নিয়মানুবর্তিতা সপ্তাহ পালন করিতেছে। আপনি সময়মত ট্রেন চলতে সাহায্য করুন।’
অন্যদিকে ১৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সতর্কবার্তার ভাষা কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। সেখানে আবেগপূর্ণ আবেদন কম, বরং শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অকারণে বিপৎসংকেতের চেইন টানা একটি বদভ্যাস, যা দূর করতে যাত্রীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। চেইন টানার ফলে ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়ে পুরো রেল চলাচল ব্যাহত হয় এবং যাত্রীদের গুরুতর অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। তাই কেবল জরুরি প্রয়োজনেই এই ব্যবস্থা ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয় যে কিছু সমাজবিরোধী ব্যক্তি রেলওয়ের বিভিন্ন ফিটিং খুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যার ফলে যাত্রীদেরই ক্ষতি হচ্ছে, তাই তাদের ধরতে রেল কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করার আহ্বান জানানো হয়।
এ বিজ্ঞাপনগুলোয় কেবল রেলওয়ের নির্দেশনা নয়, বরং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক মানসিকতা, যাত্রীসংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক ভাষার প্রকাশও উপলব্ধি করা যায়।
বিশেষ উপলক্ষকে কেন্দ্র করে রেল কোম্পানিগুলো প্রায়ই অতিরিক্ত ট্রেন চালু করত এবং ভ্রমণের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করত। জনগণের উৎসাহ ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে রেলকে আরও জনপ্রিয় করে তোলার জন্য রেল কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করত। ১৯৬২ সালের ১৮ জানুয়ারি দ্য ইস্টার্ন এক্সামিনার পত্রিকায় প্রকাশিত পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের একটি বিজ্ঞপ্তি থেকে এমনই একটি উদ্যোগের কথা জানা যায়। ‘চীফ ট্রাফিক ম্যানেজারে’র বরাতে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল:
‘১৯৬২ সালের বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচ দেখার উদ্দেশ্যে যাত্রীদের জন্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি বিশেষ ট্রেন চালানো হবে। ট্রেনটি চট্টগ্রাম থেকে রাত ২০.১৫ ঘটিকায় ছেড়ে ঢাকায় সকাল ৭.১৫ ঘটিকায় পৌঁছাবে। পথে ট্রেনটি সীতাকুণ্ড, ফেনী, কুমিল্লা, লাকসাম, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, নরসিংদী, আরিখোলা ও টঙ্গী স্টেশনে থামবে।
২। ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচ শেষ হওয়ার দিন ফেরত যাত্রীদের জন্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আরেকটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিশেষ ট্রেনটি ঢাকা থেকে রাত ২৩.৪৫ ঘটিকায় ছাড়বে।
৩। বিস্তারিত জানার জন্য স্থানীয় স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
রেল কর্তৃপক্ষ শুধু ট্রেন পরিচালনাই করত না, তারা জনজীবনের স্পন্দনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখার চেষ্টা করত। ১৬৪ বছর ধরে রেলপথ পূর্ব বাংলার মানুষের চলাচলের মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-উচ্ছ্বাস, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধেরও এক গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে কাজ করেছে। এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই পরবর্তীকালে বাংলাদেশ রেলওয়ে তার বর্তমান পরিচয়ে পৌঁছেছে। যার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল সেই ঔপনিবেশিক যুগে। বিকশিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলে এবং নতুন রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে নতুন অর্থে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
