ঈদ ঘিরে সিলেট নগরীতে বেপরোয়া চোর ও ছিনতাইকারী চক্র

সম্প্রতি সিলেট মহানগর এলাকায় কয়েকটি ছিনতাই ও চুরির ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর পর বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত পাঁচ দিনে ছয়টি থানা এলাকা থেকে প্রায় ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভিডিও ভাইরাল হলেই ছিনতাই-চুরি ঠেকাতে তৎপর হয় পুলিশ। এতে থামছে না অপরাধ। একের পর এক ঘটনায় আতঙ্কে নগরবাসী।

তারা বলছেন, ঈদের আগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চোর ও ছিনতাইকারী চক্র। পুলিশ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও সুফল মিলছে না। মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমাদের মূল কাজ নগরবাসীকে শান্তিতে রাখা। এ জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি।’

২০২৫ সালের মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এসএমপির ছয়টি থানায় যেসব মামলা হয়েছে, তার মধ্যে ছিনতাইয়ের অভিযোগ ১৮টি। তবে অধিকাংশ চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়নি। সম্প্রতি নগরীতে ২০-২৫টি ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটলেও অভিযোগ হয়েছে মাত্র চারটি। ঈদুল ফিতর সামনে রেখে মূলত ছিনতাইকারী ও চোর চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

সিলেট নগরীর কোনো না কোনো এলাকায় প্রায় প্রতিদিন দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত সোমবার আসরের নামাজের সময় নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার আনজুমান টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় চুরি হয়।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মাশহুদ আহমদ জানান, এক যুবক বাসায় ঢুকে প্রায় তিন লাখ টাকাসহ কিছু মূল্যবান মালপত্র নিয়ে গেছে। ভিডিও ফুটেজে তাকে লিফট দিয়ে ওপরে উঠতে ও নামতে দেখা গেছে। সে ওই টাওয়ারের বাসিন্দা নয়।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় ‘সিনেমাটিক স্টাইলে’ কর কর্মকর্তা এক নারীর ব্যাগ ছিনতাই করে ছয়জন। এ ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হলে নড়েচড়ে বসে ‍পুলিশ। তবে এখনও কাউকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা যায়নি। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয় এয়ারপোর্ট থানার ওসি শাহ মোবাশ্বিরকে। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই ৫ মার্চ সকালে নগরীর সাগরদীঘিরপাড় এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন এক কলেজছাত্রী। সেই ভিডিও আগের মতো ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই ছিনতাইকারীকে শনাক্ত করা যায়নি।

এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি মাইনুল জাকির জানান, ভুক্তভোগী নারী মামলা করেননি। তাঁর কিছু খোয়া যায়নি। কিন্তু পুলিশ ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারীদের ধরবেই।

গত শনিবার রাতে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে নগরীর হাওয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ১০ তরুণকে। এ বিষয়ে ওসি বলেন, এলাকার লোকজন তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তবে থানায় কোনো মামলা নেই। তাদের অতীত বিষয়ে খবর নেওয়া হচ্ছে।

এসএমপি সূত্র জানায়, রমজান মাস শুরুর পর সিলেটে চুরি ও ছিনতাই বেড়ে যাওয়ায় নানান রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে দুই নারীর কাছ থেকে প্রকাশ্যে ব্যাগ ছিনতাইয়ের ভিডিও ভাইরাল হলে এসব উদ্যোগ নেয় পুলিশ। উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে– প্রতিদিন ৬০টি ভ্রাম্যমাণ টিম ও তিনটি স্থায়ী চেকপোস্টের পাশাপাশি ১২টি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি, ২৪ ঘণ্টা নজরদারি এবং রাতে ড্রোন দিয়ে নজরদারি করা। দু-একদিনের মধ্যে প্রতিনিয়ত ড্রোন ব্যবহার করা হবে বলে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি শিবেরবাজার এলাকায় ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের সহকারী বিনিয়োগ কর্মকর্তা মিঠু দাশের আড়াই লাখ টাকা ছিনতাই, ১৯ ফেব্রুয়ারি ভোরে কিন ব্রিজের পাশে ব্যবসায়ীর টাকা ছিনতাই, একই মাসে সুবিদবাজারের এক মাদ্রাসাছাত্রের বাইসাইকেল চুরি, ৪ মার্চ আম্বরখানার সেন্ট্রাল প্লাজায় প্রবাসী রোকসানা বেগমের মালিকানাধীন দোকানে হামলা, ৬ মার্চ রাতে উপশহর থেকে এক নারীর স্বর্ণালংকার ছিনতাই, গত সোমবার রাতে নগরীর শাহি ঈদগাহ এলাকার অনামিকা ২৫/১২ নম্বর ফটকের তালা কেটে মোটরসাইকেল চুরিসহ বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে।

বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ঘটলেও এসএমপি ‘ফোকাস’ করছে ছিনতাই ঠেকাতে। ঈদ সামনে রেখে ছিনতাকারীদের তৎপরতা রুখতে পুলিশ তৎপর হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে ছিনতাইকারীসহ ২০০ জনের মতো লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে দুই নারীর ব্যাগ ছিনতাইয়ে জড়িত কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সিলেট কল্যাণ সংস্থার সভাপতি এহসানুল হক তাহের বলেন, সম্প্রতি চুরি ও ছিনতাই বেড়েছে। নারীরা মার্কেটে যেতে ভয় পাচ্ছেন। এসব রুখতে পুলিশ চেষ্টা করছে। কিন্তু মানুষের ভয় কাটছে না।

এসএমপি কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, প্রকাশ্যে দুটি ছিনতাইয়ের ঘটনার পর আমরা ছিনতাই রোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের ‍মূল উদ্দেশ্য নগরবাসীকে শান্তিতে রাখা। শুধু ছিনতাই প্রতিরোধ নয়, সব ধরনের অপরাধ রুখতে পুলিশ কাজ করছে। বিভিন্ন টিমের পাশাপাশি দু-একদিনের মধ্যে রাতের নগরী ড্রোন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে। আমরা যা করছি তার সফলতা জনগণ বলতে পারবে।

জানতে চাইলে স্থানীয় এমপি (সিলেট-১ আসন) এবং বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, সিলেট নগরীর ছিনতাই রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি। ঈদ সামনে রেখে যাতে নগরবাসী কেনাকাটাসহ শান্তিতে বসাবস করতে পারেন, সে জন্য পুলিশ প্রশাসন উদ্যোগও নিয়েছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন