‘ঈদসংখ্যা’ এখন বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ

ঈদকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত বিশেষ সাময়িকী ‘ঈদসংখ্যা’ এখন বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমন মন্তব্য করেছেন ‘আগামীর সময়’-এর আবাসিক সম্পাদক আহমেদ নূর।
রবিবার (২৬ এপ্রিল) বাংলামেইল আয়োজিত ‘ঈদসংখ্যা সংস্কৃতি: বাঙালির উৎসব ও সৃজনধারা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের উদযাপন শুধু ধর্মীয় বা পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বিস্তৃত হয়েছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক বৃহৎ পরিসরে।’
আহমেদ নূর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘একসময় ঈদ মানেই ছিল নতুন জামা, সেমাই আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি। তখন বিনোদনের মাধ্যমও ছিল সীমিত—সিনেমা দেখা বা একসঙ্গে সময় কাটানোই ছিল বড় প্রাপ্তি। তবে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে এই উদযাপন ধীরে ধীরে সাহিত্যিক রূপ নিতে শুরু করে, যার ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে ঈদসংখ্যার ঐতিহ্য।’

তিনি বলেন, ‘বাংলা সাময়িকপত্রে প্রথম ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে ‘নব নূর’ পত্রিকায়, যার সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ এমদাদ আলী। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ১৯৪০-এর দশকে, এই ধারার ব্যাপক বিস্তার ঘটে এবং তা ক্রমে একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।’
সিলেটের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আজীবন সাধারণ সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল হক সম্পাদিত ‘আল ইসলাহ’ (১৯৩৬) সহ পূর্বালী, চিত্রালী, রূপালী, সন্ধানী ও বিচিত্রার মতো পত্রিকাগুলো ঈদসংখ্যাকে সমৃদ্ধ করেছে। এসব প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা সংযোজিত হয়েছে।’

একসময় জাতীয় দৈনিকগুলো এই ধারায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও পরবর্তীতে তারা বৃহৎ পরিসরে ঈদসংখ্যা প্রকাশ শুরু করে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর ফলে ঈদসংখ্যা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারায় রূপ নেয়, যেখানে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, সাক্ষাৎকারসহ নানা ধরনের লেখা স্থান পায়।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আহমেদ নূর বলেন, ‘২০১৮ সালে ‘সিলেট মিরর’ প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার একটি ঈদসংখ্যা প্রকাশ করেছিলাম, যেখানে জাতীয় পর্যায়ের লেখকদের অংশগ্রহণ ছিল এবং সম্মানী দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে করোনা মহামারি ও আর্থিক সংকটের কারণে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।’

তবুও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘ঈদসংখ্যার এই সাংস্কৃতিক ধারা থেমে থাকার নয়। ঈদ এখন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক উদযাপন।’

বাংলামেইলের প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলামেইল সম্পাদক দৈয়দ নাসির আহমদ নিয়মিতভাবে সমৃদ্ধ ঈদসংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে এই ধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন। গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব কেবল পেশাগত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই পেশা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার দায়ও বহন করতে হয়। ঈদসংখ্যা সেই দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।’

আলোচনা সভায় বিশেষ আলোচকের বক্তব্য দেন সৈয়দ মবনু। তিনি বলেন, ‘ঈদসংখ্যা মনন গঠনে কাজ করে। আমি আমার নিজের ক্ষেত্রেও এটা লক্ষ্য করেছি। আমাদের ছোটোবেলায় মাকে দেখতাম ঈদসংখ্যা সংগ্রহ করে রাখতেন। সেখান থেকেই আমাদের পরিবারে মননচর্চা ও সাহিত্যসংশ্লিষ্টতার শুরু। বাংলামেইল সম্পাদক সৈয়দ নাসির আহমদ নিয়মিতভাবে সমৃদ্ধ ঈদসংখ্যা প্রকাশ করবেন বলে প্রত্যাশা করছি।’
বিশেষ আলোচকের বক্তব্যে সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদসংখ্যা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি এখন আমাদের সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে গিয়েছে। ঈদ উপলক্ষ্যে এই বিশেষ প্রকাশনা উৎসবটিকে আরও সার্বজনীন করে তুলে। পাঠকরা যেন বাংলামেইল সম্পাদক সৈয়দ নাসির আহমদ সম্পাদিত ঈদসংখ্যা প্রতিবছর পান, সেই প্রত্যাশা রইল।’

নাট্যকার বাবুল আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন দৈনিক সুরমা মেইলের প্রধান সম্পাদক গল্পকার সেলিম আউয়াল, কবি ও প্রকাশক মালেকুল হক, দৈনিক কালের কণ্ঠের ব্যুরো প্রধান ইয়াহইয়া ফজল, নাট্যকার ও প্রকাশক সুফি সুফিয়ান, সিলেট ভয়েসের প্রকাশক সেলিনা চৌধুরী, দৈনিক সিলেটের ডাকের সাহিত্য সম্পাদক ফায়যুর রাহমান, প্রাবন্ধিক মীনাক্ষী সাহা, কবি ও চিন্তক ওয়াহিদ রোকন, প্রাবন্ধিক হেলাল হামাম, সাংবাদিক শাকিলা ববি, ক্রীড়া সাংবাদিক রাফিদ চৌধুরী, সাংবাদিক লতিফুর রহমান উজ্জ্বল, পাঠক সংঘ শৈলীর সভাপতি অরুপ নাগ, প্রচ্ছদশিল্পী ও সম্পাদক নাওয়াজ মারজান, কবি ও সম্পাদক হুসাইন ফাহিম, কবি ও সম্পাদক সাইয়্যিদ মুজাদ্দিদ, সংগঠক আনারুল ইসলাম, কবি ও সাংবাদিক জেনারুল ইসলাম।

জান্নাতুল নাজনীন আশার সঞ্চালনায় এসময় উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ তাজুল ইসলাম, রাসেল আহমদ, ওলিউর রহমান, আতিক হাসান মিলটন, তাহরিম বখত, মারওয়ান আহমদ, মুহাম্মদ আব্দুল কাদির, সাগর সাব্বির, মুশতাক মুহাম্মদ, লাবীব নাওয়াজ, হেলাল আহমেদ, তাকি নাওয়াজ, সৈয়দ ত্বোহা, সৈয়দ নাহিয়ান, মুস্তাফিজ আরএস প্রমুখ।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন