ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনা

প্রথমার্ধের ভীষণ বাজে ফুটবলের পর, অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে বদলে যায় ম্যাচের গতিপথ। পিছিয়ে পড়ে আক্রমণের ঝড় তোলে আর্জেন্টিনা। অনেক প্রচেষ্টা বিফলে যাওয়ার পর, দর্শনীয় গোলে দলকে পথে ফেরান এন্সো ফের্নান্দেস। এরপর, লিওনেল মেসির মাপা ক্রসে বলকে ঠিকানায় পাঠালেন লাউতারো মার্তিনেস। বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ল আর্জেন্টিনা, ফাইনালে পৌঁছে গেল লিওনেল স্কালোনির দল।

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বুধবার বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমি-ফাইনালে ২-১ গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা।

গর্ডনের গোলে পিছিয়ে পড়ার পর সমতা টানেন ফের্নান্দেস। আর শেষ সময়ে ব্যবধান গড়ে দেন লাউতারো মার্তিনেস।

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের দুই ও চার নম্বর দলটির মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচটির দুই অর্ধের গল্প পুরোই ভিন্ন। এখানে প্রথমার্ধে ফুটবলের রূপটা ছিল কুৎসিত। সত্যিকার ফুটবল তখন হয় যৎসামান্য। দুই দলই মেতে ওঠে শারীরিক শক্তি নির্ভর লড়াইয়ে। হতে থাকে ফাউলের পর ফাউল; এই সময়ে ফাউল হয় ১৯টি।

তবে পরের অর্ধের গল্পটা সুন্দর ফুটবলের। যেখানে ধাক্কা খেয়ে পাল্টে যায় আর্জেন্টিনা। আক্রমণের পর আক্রমণে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে তুলে নিল দারুণ এক জয়।

বিপরীতে, আরও একবার খেই হারিয়ে ব্যর্থতার গল্প লিখল ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ীদের দ্বিতীয়বার ফাইনালে খেলতে না পারার হতাশার যাত্রা দীর্ঘায়িত হলো আরও।

পুরো ম্যাচে প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বল দখলে রেখে, গোলের জন্য ১৫টি শট নিয়ে পাঁচটি লক্ষ্যে রাখতে পারে আর্জেন্টিনা। ইংলিশদের পাঁচ শটের দুটি লক্ষ্যে ছিল।

আগামী রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।

প্রথম ৪৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা ফাউল করে ১২টি, ইংল্যান্ড সাতটি। দুই দলেরই একজন করে দেখেন হলুদ কার্ড।

গোলের জন্য আর্জেন্টিনা দুটি ও ইংল্যান্ড একটি শট নেয়, যদিও কারো শটই ছিল লক্ষ্যে।

মাঠের লড়াই শুরু হতেই দুই দলের খেলোয়াড়দের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ফুটে ওঠে। জুড বেলিংহ্যামকে অহেতুক গুঁতো মারেন লেয়ান্দ্রো পারেদেস। মেসিকে একটু আগ্রাসীভাবে চ্যালেঞ্জ জানান এলিয়ট অ্যান্ডারসন, পরক্ষণেই প্রতিশোধ নিতে এই ইংলিশ মিডফিল্ডারকে বাজেভাবে ফাউল করেন এন্সো ফের্নান্দেস।

এই সবকিছুই ঘটে প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যে। ১০ মিনিটে কোনো উল্লেখযোগ্য আক্রমণের দেখা মেলেনি; কিন্তু রেফারি ফাউলের বাঁশি বাজান ছয়বার।

ফুটবলের ভীষণ বাজে প্রদর্শনীর মাঝে ৩৩তম মিনিটে ম্যাচে গোলের জন্য প্রথম প্রচেষ্টাটি নেয় ইংল্যান্ড, যদিও জন স্টোন্সের হেড লক্ষ্যের ধারেকাছেও ছিল না।

চার মিনিট পর, পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষের দুজনের কড়া চ্যালেঞ্জ সামলে ছুটে যাচ্ছিলেন মেসি, কিন্তু এরপরই তাকে বাজেভাবে ফাউল করে ম্যাচে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন এলিয়ট অ্যান্ডারসন। একটু পরই মর্গ্যান রজার্সকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই দৃশ্যপট বদলের আভাস মেলে। প্রতিপক্ষের দুর্বল আক্রমণ রুখে, পাল্টা আক্রমণে ডি-বক্সে ঢুকে জোরাল শট নেন হুলিয়ান আলভারেস, ঝাঁপিয়ে আটকান গোলরক্ষক। ফিরতি বল পেয়ে একজনকে কাটিয়ে আবার শট নেন আতলেতিকো মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড, বল আরেকজনের পায়ে লেগে বাইরে যায়।

অবশেষে ৫৫তম মিনিটে ম্যাচের ডেডলক ভাঙতে পারে ইংল্যান্ড। প্রতি-আক্রমণে উড়ে আসা বল প্রথমে আটকানোর সুযোগ পেয়েও পারেননি নিকোলাস তালিয়াফিকো। তার ব্যর্থতায় সতীর্থ ঘুরে বল পেয়ে ডান দিক থেকে গোলমুখে দারুণ ক্রস বাড়ান রজার্স, আর নিখুঁত টোকায় বল জালে পাঠান গর্ডন। তার সঙ্গেই লেগে ছিলেন নাউয়েল মলিনা, কিন্তু বলের গতি-প্রকৃতি বুঝতেই পারেননি এই রাইট-ব্যাক।

বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের চতুর্থ গোলদাতা হলেন গর্ডন।

তিন মিনিটের মধ্যে দারুণ এক আক্রমণ শাণায় আর্জেন্টিনা। বল পায়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন দলে ফেরা সিমেওনে, তবে তার শট নেওয়ার আগমুহূর্তে দারুণ ক্ষিপ্রতায় অসাধারণ এক ট্যাকলে দলকে বিপদুমক্ত করেন ডিফেন্ডার জেড স্পেন্স।

দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেকের আগে গোল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু মেসির ক্রসে নিকোলা হন্সালেসের হেড দারুণ নৈপুণ্যে আটকে দেন জর্ডান পিকফোর্ড।

এই বিরতি থেকে ফেরার পর, আর্জেন্টাইনদের মরিয়া ভাব ফুটে উঠতে থাকে। দুর্ভাগ্য বাধা হয়ে না দাঁড়ালে, ৭৬তম মিনিটে গোল পেতে পারতো তারা। বদলি নেমে দারুণ এক ক্রস বাড়ান রদ্রিগো দেল পল, ডাইভিং হেড করেন আলেক্সিস মাক আলিস্তের, কিন্তু বল লাগে পোস্টে।

অনেক প্রচেষ্টা নষ্ট হওয়ার পর, ৮৫তম মিনিটে একক প্রচেষ্টায় অসাধারণ গোলে সমতা টানেন ফের্নান্দেস। ডান দিক থেকে মেসির পাস ডি-বক্সের অনেকটা বাইরে পেয়ে জোরাল শট নেন চেলসি মিডফিল্ডার, বল হাওয়ায় ভেসে খুঁজে নেয় ঠিকানা।

গোলটি যেন ইংল্যান্ড শিবিরে জোর ধাক্কা হয়ে আসে। আবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তেমন মরিয়া চেষ্টাই দেখা যায়নি তাদের মধ্যে। আর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে পিছিয়ে পড়ার পর পুরোপুরিই খেই হারিয়ে ফেলে তারা।

মাক আলিস্তেরের আরেকটি শট পোস্টে প্রতিহত হলে হয়তো হাফ ছেড়েছিল ইংল্যান্ড; তবে সেটা কেবলই মুহূর্তের জন্য। ডান দিকে বল পেয়ে ডি-বক্সে দারুণ ক্রস বাড়ান মেসি এবং অরক্ষিত মার্তিনেস নিখুঁত হেডে গড়ে দেন ব্যবধান।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই নিয়ে তৃতীয় জয় পেল আর্জেন্টিনা, এবং কাকতালীয় ব্যাপার- তিনটিই তাদের নীল জার্সি (অ্যাওয়ে) পরে এবং তিনটিই বিশ্বকাপে!

একই সঙ্গে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে শতভাগ সাফল্যের ধারাও ধরে রাখল লাতিন আমেরিকার দলটি; তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা ছয় ম্যাচ খেলে জিতল ছয়টিতেই।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন