ইরানে ব্যর্থ মার্কিন ডেল্টা ফোর্স

ইরানের মরুভূমিতে গোপন সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে ভয়াবহ ব্যর্থতার মুখে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত বাহিনী ডেল্টা ফোর্স। ১৯৮০ সালে পরিচালিত সেই অভিযানে প্রাণ হারান আট মার্কিন সেনা, আর জীবন বাঁচাতে পালাতে গিয়ে হেলিকপ্টার, অস্ত্র, মানচিত্র এমনকি সহকর্মীদের মরদেহও ফেলে যেতে বাধ্য হয় বাহিনীটি। সামরিক ইতিহাসে ঘটনাটি আজও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লজ্জাজনক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত।১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল করে নেয় বিপ্লবী ছাত্ররা। ওই ঘটনায় ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মীকে জিম্মি করা হয়। দীর্ঘ কয়েক মাস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েও জিম্মিদের মুক্ত করতে ব্যর্থ হলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের ওপর রাজনৈতিক চাপ চরমে পৌঁছায়।

শেষ পর্যন্ত ১৯৮০ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট কার্টার গোপন সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন। অভিযানের নাম ছিল অপারেশন ইগল ক্ল। দায়িত্ব দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্সকে। লক্ষ্য ছিল তেহরানের মার্কিন দূতাবাস থেকে জিম্মিদের উদ্ধার করে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা।পরিকল্পনা অনুযায়ী সি-১৩০ পরিবহন বিমান ও আরএইচ–৫৩ডি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে প্রবেশ করার কথা ছিল বাহিনীর। প্রথম ধাপে ইরানের মরুভূমির একটি গোপন স্থানে—‘ডেজার্ট ওয়ান’—একত্রিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযান শুরু হতেই একের পর এক বিপর্যয় দেখা দেয়।

প্রচণ্ড বালুঝড় ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আটটি হেলিকপ্টারের মধ্যে তিনটি অকেজো হয়ে পড়ে। ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টার না থাকায় অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রত্যাহারের সময় ঘটে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি আরএইচ–৫৩ডি হেলিকপ্টার অতিরিক্ত জ্বালানি বহনকারী একটি সি-১৩০ বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণে উভয় উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়।

এ ঘটনায় পাঁচজন বিমান বাহিনীর সদস্য ও তিনজন মেরিন,মোট আটজন মার্কিন সেনা নিহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ডেল্টা ফোর্সকে দ্রুত এলাকা ছাড়তে হয়। তাড়াহুড়োয় তারা ফেলে যায় হেলিকপ্টার, অস্ত্র, গোপন মানচিত্র এবং নিহত সহকর্মীদের মরদেহ।এই ব্যর্থ অভিযানের পর বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। অনেক বিশ্লেষকের মতে, অপারেশন ইগল ক্লের ব্যর্থতা ১৯৮০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিমি কার্টারের পরাজয়ের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী ঘটনাটিকে বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে “ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিরোধ” বলে আখ্যা দেন।

তবে এই ব্যর্থতা থেকেই বড় শিক্ষা নেয় যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে বিশেষ অভিযান কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কার আনা হয় এবং গঠন করা হয় যুক্তরাষ্ট্র স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড। তবুও সামরিক ইতিহাসে অপারেশন ইগল ক্ল আজও স্মরণ করা হয়। ডেল্টা ফোর্সের সবচেয়ে ব্যর্থ, কিন্তু সবচেয়ে শিক্ষণীয় অধ্যায় হিসেবে।
বিভাগ : আন্তর্জাতিক

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন