পবিত্র ঈদুল আজহা ইসলামের অন্যতম প্রধান বাৎসরিক উৎসব। ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি করা সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব। আমাদের দেশে প্রতি বছরই ঈদুল আজহায় প্রচুর পশু কোরবানি হয়। গ্রামাঞ্চলে পশু কোরবানির উপযুক্ত জায়গার তেমন অভাব নেই। পশু কোরবানির পর একটু সচেতন হলে খুব সহজেই পশুর রক্ত, বর্জ্য মাটি চাপা দেওয়া যায়। এরপরও সচেতনতার অভাবে রক্ত-বর্জ্য উন্মুক্ত ফেলে রেখে পরিবেশ দূষিত করেন অনেকে।
নগরাঞ্চলে এই সংকট আরও প্রকট। বিশেষত ঢাকার মত ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে পশু কোরবানির উপযুক্ত জায়গা না থাকায় বাড়ির সামনে মানুষ চলাচলের পাকা রাস্তায়ই প্রচুর কোরবানি হয়। পশু কোরবানির পর কোরবানির রক্ত-বর্জ্য পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন না করায় রক্ত-বর্জ্য পঁচে দুর্গন্ধ ছড়ায়, পরিবেশ দূষিত হয়।
মুসলমান হিসেবে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতাকে গুরুত্ব দেওয়া আমাদের কর্তব্য। পুরো শহর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, কিন্তু আমরা সবাই যেন অন্তত যদি নিজের বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের জায়গা এবং রাস্তার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হই।
আল্লাহ তাআলা পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন, যারা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকে, তাদেরও তিনি পছন্দ করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের। (সুরা বাকারা: ২২২)
বিখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহ.) বলতেন, আল্লাহ তা’আলা পবিত্র এবং পবিত্রতা ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন এবং পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। তিনি মহান ও দয়ালু, মহত্ব ও দয়া ভালোবাসেন। তিনি দানশীল, দানশীলতাকে ভালোবাসেন। সুতরাং তোমরাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেক। তোমাদের আশপাশের পরিবেশকেও পরিচ্ছন্ন রাখ এবং ইয়াহুদিদের অনুকরণ করো না। (সুনানে তিরমিজি)
নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অংশ ঘোষণা করে বলেছেন, পবিত্রতা পাক-পবিত্রতা হলো ইমানের অর্ধেক। (সহিহ বুখারি)
ইসলামের বুনিয়াদি কাঠামোর দিকে তাকালেও বোঝা যায় পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে নামাজের জন্য শরীর ও পোশাকের পবিত্রতাকে ফরজ করা হয়েছে। পবিত্রতা ছাড়া নামাজ শুদ্ধ হয় না। ফলে একজন মুসলমান যিনি দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, তাকে অবশ্যই পবিত্র-পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়।
বাড়ির আশপাশ ও রাস্তাঘাট নোংরা করে পরিবেশ দূষিত করা এ কারণেও গর্হিত অন্যায় কাজ কারণ এটা প্রতিবেশী ও অন্যান্যদের কষ্ট ও ক্ষতির কারণ হয়। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনও অন্যদের কষ্টের কারণ হয় না। নবী করীম (সা.) বলেছেন, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি যার কথা ও কাজ থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকে। (সহিহ মুসলিম)
বরং একজন মুসলমানের কর্তব্য রাস্তাঘাট থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী বা কষ্টদায়ক যে কোনো বস্তু সরিয়ে ফেলা যদিও সেটা সে নিজে না ফেলে থাকে। হাদিসে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাকে ইমানের দাবি বলা হয়েছে। নবী করীম (সা.) বলেন, ইমানের সত্তর বা ষাটের বেশি শাখা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম শাখা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, আর সর্ব নিম্নস্তরের শাখা হলো, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। (সহিহ মুসলিম)
চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা আল্লাহ তাআলার এত পছন্দনীয় আমল যে এটা জান্নাত লাভের কারণও হতে পারে। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কাঁটাযুক্ত ডাল দেখে বললো, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই মুসলমানদের চলাচলের রাস্তা থেকে এটা সরিয়ে দেবো যেন এটা তাদের কষ্টের কারণ না হয়। এই আমলের কারণে তাকে জান্নাত দান করা হয়। (সহিহ মুসলিম)
সুতরাং আমরা নিজেরা যেমন কোরবানির পশুর রক্ত-বর্জ্য উন্মুক্ত ফেলে রাখাসহ যে কোনোভাবে রাস্তাঘাট নোংরা করা থেকে বিরত থাকবো, চলার পথে পড়ে থাকা কোনো কাঁটা, পাথর, পশুর রক্ত, হাড় কিংবা যেকোনো দৃষ্টিকটু নোংরা জিনিস যা পথচারীর কষ্টের কারণ হতে পারে, তা দূর করতেও সচেষ্ট হবো। আল্লাহ তওফিক দিন।