কর্মসংস্থানের সুযোগসহ উন্নত বিশ্বে পাঠানোর প্রলোভনে পড়েছিলেন রমজান হোসেন খাঁন ও তার শ্যালক। একপর্যায়ে তারা যোগাযোগ করেন একটি প্রতারক চক্রের সঙ্গে। মোটা অর্থের বিনিময়ে চক্রের সঙ্গে চুক্তিও হয়। কিন্তু ভুক্তভোগীদের অর্থ হাতিয়ে কয়েকটি দেশে পাঠানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় চক্রটি।
পরে সার্বিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ভুক্তভোগীদের তুলে দেওয়া হয় শ্রীলঙ্কান মাফিয়াদের হাতে। সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে বাঁচেন ভুক্তভোগীরা। দেশে ফিরে দ্বারস্থ হন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এমনই একটি প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৪।
মঙ্গলবার (৯ জুন) মিরপুরে র্যাব-৪ ব্যাটালিয়ন সদরদপ্তরে আয়োজিত ‘ইউরোপে পাঠানোর ফাঁদে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের ৩ সদস্য গ্রেফতার’ সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-৪ এর সদর কোম্পানি কমান্ডার মেজর শেখ আরমান হোসাইন হৃদয়।
গ্রেফতাররা হলেন—শেখ মো. সাদী (৪১), মো. নাহিন (২৫) ও জাহাঙ্গীর আলম (২৪)।
শেখ আরমান হোসাইন হৃদয় বলেন, বিভিন্ন ভিসায় প্রতারণার মাধ্যমে ক্রোয়েশিয়া, সার্ভিয়া, পর্তুগাল, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশে লোভনীয় চাকরি এবং স্টুডেন্ট ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে বিশাল অংকের অর্থ আত্মসাৎকারী একটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, গত ২৮ মে রমাজন হোসেন খাঁন আমাদের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেন যে, তিনি এবং তার শ্যালক এই চক্রের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেন। এ ঘটনায় র্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক দল গতকাল সোমবার (৮ জুন) রাতে একটি অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে চক্রের মূলহোতাসহ তিনজনকে গ্রেফতার ও আলামত জব্দ করা হয়।
ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে শেখ আরমান হোসাইন হৃদয় বলেন, ভুক্তভোগী রমজান তার এক পূর্বপরিচিত আত্মীয়ের মাধ্যমে জানতে পারেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ‘জাহরা সাদী টিকেটিং অ্যান্ড ট্রাভেলিং/জেএস এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস’ নামে ভিসা প্রসেসিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রোয়েশিয়া, সার্ভিয়া, পর্তুগাল, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশে বৈধভাবে লোক পাঠায়। তাদের সেখানে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ করে দেয়। এরপর তারা সেখানে যোগাযোগ করলে আসামি শেখ মো. সাদী ও তার সহযোগীরা ভুক্তভোগীদের প্রথমত ক্রোয়েশিয়া পাঠানোর প্রস্তাব দেন।
আসামিদের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন জনপ্রতি ১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে চুক্তিতে তারা ওয়ার্ক পারমিটসহ ইতালি পাঠিয়ে থাকেন। ভুক্তভোগীরা সরল বিশ্বাসে তাদের প্রস্তাবে রাজি হন এবং বিভিন্ন চুক্তিনামায় সই করেন। পরবর্তীকালে আসামিদের বিভিন্ন সময়ে মোট ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদ ও ব্যাংকের মাধ্যমে দেন। প্রথমত, আসামিরা ভুক্তভোগীদের ক্রোয়েশিয়া পাঠানো কথা বলেন।
ক্রোয়েশিয়া পাঠাতে না পারায় ৬ মাস পর পর্তুগাল পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। এরপর ভারতীয় দূতাবাসে পাঠানোর পর ৭২ দিন অতিবাহিত হলেও তাদের দূতাবাস ক্লিয়ারেন্স করাতে না পারায় ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আসামিরা ভুক্তভোগীদের নিউজিল্যান্ডের ভিসা দেওয়ার কথা বলে কয়েক মাস পর ভিসা দেখায়। যা যাচাই করলে ভুয়া ভিসা প্রমাণিত হয়। একপর্যায়ে আসামিরা তাদের সার্বিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর জন্য শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়ে সেদেশের মাফিয়াদের হাতে তুলে দেন।
তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা কৌশলে শ্রীলঙ্কা থেকে ফেরত আসেন এবং জানতে পারেন, তারা প্রতারিত হয়েছেন। পরবর্তীতে আসামিদের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেন। পরে র্যাব-৪ এর আভিযানিক দল আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে গতকাল (৮ জুন) রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেফতার ও আলামত জব্দ করে।
আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য জানিয়ে র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার মাধ্যমে অনেক বাংলাদেশির কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়েছে।
