বাংলাদেশের ইতিহাসে সিলেট অঞ্চলের নিজস্ব একটি ভাষা রয়েছে। অতি প্রাচীন থেকে প্রাচীন এই ভাষার নাম হচ্ছে নাগরি! এটি মূলত সংস্কৃত ভাষায় ব্যবহার হতো। নাগরি লিপির স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জন বর্ণ মিলে মোট ৩৩ টি বর্ণ রয়েছে। শ্রীহট্র তথা সিলেট অঞ্চলে এর আবিস্কার সম্পর্কে জানা যায় ধর্মযাজক মুযররদ শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন সিলেটে আগমন করেন তখন তিনি এই নাগরিলিপি সাথে নিয়ে এসেছিলেন,তবে নাগরির জন্ম এক থেকে দশম শতাব্দীর ভিতরেই।
সেই সুলতানি আমল থেকে বিভিন্ন সময়ে চিঠিপত্র প্রাপ্তি সনদে, বা সাহিত্য কর্মে এই ভাষার ব্যবহার হতো। জানা যায় ১৪০ টি সাহিত্য রচনা হয়েছে এই নাগরি বর্ণে। নবাবি আমলের সময়েও দলিলাদিতে এই নাগরি লিপির ব্যবহার হয়েছে বলে আন্দাজ করা হয়।
মুক্তাক্ষরে ফ্রন্টের স্টাইল বা বৈশিষ্ট ছিলো নাগরি লিপির। ১৯৮০ ইংরেজির দিকে প্রাচীন এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষা রক্ষার্থে সফটওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারে নাগরি ফ্রন্ট তৈরি করা হয় সিলেটের নিজস্ব এই ভাষার। কালের বিবর্তনে ধিরে ধিরে নাগরি লিপি বিলুপ্ত প্রায়। লেখালেখিতে এর কদর কমে গেলেও ফের নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের কাছে নাগরির পরিচয়।
সিলেটে নাগরি ভাষার আন্দোলনের সফলতা হলো সিলেট শহরে নাগরি চত্বরের কাজ। ইতিমধ্যে নাগরিলিপির প্রশিক্ষণ গ্রহন করারও একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। লেখকগন এবিষয়ে অসংখ্য বই লিখেছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি আঞ্চলিক ভাষার রুপরেখা নিয়ে সরকারি ভাবে এর স্বীকৃতির ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের অন্য কোনো অঞ্চলে এরকম নিজস্ব ভাষার আবিষ্কার নেই।
নাগরি ভাষায় ইতিহাস রচনা করেছেন যারা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সাদেক আলী ওরুফে গৌর কিশোর সেন তিনি ১৭৯৮ ইংরেজিতে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউরায় জন্ম গ্রহন করেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহনের পর তিনি সিলেট নাগরি সাহিত্যের উপর যথেষ্ট অবদান রাখেন। এছাড়াও নাগরি সাহিত্য রচয়িতাদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী, মুন্সি ইরফান আলী, শাহ হরমুজ আলী, আমান উল্লা, হাজী ইয়াসিন, গোলাম হুসেন সহ অনেকই। গোলাম হোসেন রচিত তালিব হুসন গ্রন্থ নাগরি ভাষায় রচিত গ্রন্হের প্রথম দিকের রচনা হিসেবে ধরা হয়।
সিলেটের নাগরি ভাষার ইতিহাস নিয়ে যারা বই লিখেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন অত্যুতচরণ চৌধুরী। ১৯১০ সালে প্রকাশিত তাঁর শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে সিলেটি মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত নাগরাক্ষরের কথা উল্লেখ করে গেছেন। চৌধুরী গোলাম আকবর ১৯৭৮ সালে প্রকাশ করেন সিলেটি নাগরি পরিক্রমা। লন্ডনে নাগরি ভাষা ইনস্টিটিউট’ রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া যায়।
