সড়কজুড়ে সবুজের ছায়া। দুই পাশে সারি সারি বড় গাছ। দীর্ঘদিন ধরে এসব গাছই সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ (সাচনা বাজার) সড়ককে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য।
সড়কটির সেই সবুজের বড় একটি অংশ এখন আর নেই। একের পর এক গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। গত ১৫ দিনে কাটা হয়েছে এক হাজারের বেশি গাছ। অবশিষ্ট গাছগুলোর গায়েও পড়েছে কাটার চিহ্ন।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) একং বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের আব্দুজ জহুর সেতু থেকে জামালগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্র সাচনা বাজার পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ কিলোমিটার। টুকের বাজার, গৌরারং, ইচ্ছারচর, বেড়াজালি, ইসলামগঞ্জ, আহমদাবাদ, নিয়ামতপুর, শালমারা, কলায়া, দুলবারচর, সংগ্রামপুর, শেরমস্তপুর, নজাতপুর, কুকড়াপশী, ভরতপুরসহ পুরো সড়কের দুই পাশে রয়েছে এসব গাছ।
সরকারি নথি অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সংখ্যা মোট চার হাজার ৮৮৪।
এর বাইরে জ্বালানি কাঠ হিসেবে ২২৬টি গাছের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সুনামগঞ্জ বন বিভাগ বলছে, ২০০৩-২০০৪ সালে সামাজিক বনায়নের আওতায় এসব গাছের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনেক গাছ মারা যাচ্ছে এবং পরিপক্ব গাছ নিয়ম অনুযায়ী নিলামে বিক্রি করা হয়েছে।
এদিকে সড়কের গাছ কাটার এই কারণ নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। বন বিভাগের পক্ষ থেকে সড়ক সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও সওজের পক্ষ থেকে ওই সড়ক সম্প্রসারণের কোনো চলমান প্রকল্প না থাকার কথা জানানো হয়েছে। ফলে গাছ কাটার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
স্থানীয় উপকারভোগীদের অভিযোগ, কয়েক কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করা হয়েছে। তাদের দাবি, গাছগুলো আরো কয়েক বছর রাখা হলে সরকারি সম্পদ থেকে বেশি রাজস্ব পাওয়া সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী উপকারভোগীরাও বেশি অর্থ পাওয়ার সুযোগ পেতেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাছ কাটার উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের মার্চেও সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় গাছের গায়ে লাল কালিতে নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। গাছ বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বানেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয়দের প্রতিবাদ ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সেই উদ্যোগ স্থগিত রাখা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এবার কৌশল বদলে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের অংশ বাদ দিয়ে জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা উপজেলায় সংযোগ উড়াল সড়কের জন্য সড়ক প্রশস্ত করার দোহাই দিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার অংশ থেকে গাছ কাটার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সড়কের দুই পাশে রয়েছে রেইনট্রি, কড়ই, আকাশমণি, অর্জুন, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় উপকারভোগীদের পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা এসব গাছ দীর্ঘদিন ধরে পথচারীদের ছায়া দেওয়ার পাশাপাশি পাখির আবাসস্থল হিসেবেও ভূমিকা রাখছিল।
রবিবার (২৩ আগস্ট) সকালে সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে কেটে ফেলা গাছের গুঁড়ি ও বড় বড় টুকরা পড়ে রয়েছে। কোথাও শ্রমিকরা গাছ কাটছেন, কোথাও কাটা গাছ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেক অংশে আগে যে জায়গা ঘন সবুজে আচ্ছন্ন ছিল, এখন তা হয়ে পড়েছে ফাঁকা।
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজারের বাসিন্দা মো. খুরশিদ মিয়া বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে সারা দেশে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন, সেখানে সুনামগঞ্জ বন বিভাগ গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের নীতির সাংঘর্ষিক বলে আমি মনে করি।’
সুনামগঞ্জ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘সামাজিক বনায়নের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গাছগুলো কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, জামালগঞ্জ অংশের গাছ বিক্রি হয়েছে ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। সদর অংশের গাছ বিক্রি হয়েছে ২৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকায়। দুই অংশ মিলিয়ে গাছগুলোর বিক্রয়মূল্য ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরো বলেন, সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী বিক্রির অর্থের ৫৫ শতাংশ পাবেন উপকারভোগীরা। বন অধিদপ্তর পাবে ১০ শতাংশ, ভূমির মালিক হিসেবে সওজ পাবে ২০ শতাংশ এবং ইউনিয়ন পরিষদ পাবে ৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ দিয়ে নতুন করে গাছ লাগানো হবে।
রেঞ্জ কর্মকর্তার ভাষ্য, বন বিভাগের তালিকাভুক্ত টাঙ্গাইলের দুটি, সিলেটের একটি ও দোয়ারাবাজারের একটি—মোট চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গাছ কাটার কার্যাদেশ পেয়েছে। নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়ক প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। গাছ কাটার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু জানা নেই। বন বিভাগ থেকে গাছ কাটার একটি দরপত্রের কপি শুধু তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেন, ‘বর্তমান জেলা প্রশাসকের দায়িত্বকালে, অর্থাৎ গত তিন-চার মাসে এ ধরনের কোনো অনুমোদন হয়নি। এর আগে অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও ফাইল দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।’
