মৌলভীবাজারে জামায়াতের দলীয় প্রোগ্রামে অংশ না নেওয়ায় মসজিদের ইমামকে প্রকাশ্যে অপমান এবং পরবর্তীতে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৪ নভেম্বর (২০২৫) মৌলভীবাজার পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের দ্বারক জামে মসজিদে এই ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ইমাম হাফেজ মাসুম আহমেদ জানান, তিনি দীর্ঘ ৫ বছর উক্ত মসজিদে ইমামতি করছেন। তিনি নিজেও জামায়াতের একজন কর্মী হিসেবে পরিচিত। গত ১৪ নভেম্বর স্থানীয় জামায়াত নেতা ফুয়াদ আহমদ তাকে একটি দলীয় প্রোগ্রামের জন্য আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে তিনি যেতে অপরাগতা প্রকাশ করলে পরদিন আসর নামাজের পর মসজিদের ভেতরেই তাকে অপদস্থ করা হয়।
হাফেজ মাসুম বলেন, “ফুয়াদ ভাই সবার সামনে আমাকে বলেন—সংগঠন করলে ভালোমতো করো, নাহলে ছেড়ে দাও। আমি আমার ব্যস্ততার কথা বললে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে মসজিদের ভেতরেই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। মুসল্লিরা নামাজে বিঘ্ন ঘটছে জানালে তিনি তাদের সাথেও অত্যন্ত অশোভন আচরণ করেন।”
মাসুম বলেন, “মসজিদের মোতোয়াল্লি আছগর ভাই আমাকে হঠাৎ করে বলেন যে আমার বেতন নাকি ২ হাজার টাকা কমেছে, অথচ আমার আগের দুই মাসের বকেয়া বেতন পাওনা ছিল। হুট করেই বেতন কমালেন, কিন্তু সাবেক পাওনা বেতন তো ঠিক রাখবেন! না, তিনি আগের বকেয়াসহ নতুন এক মাসের বেতন আমাকে দেন ২ হাজার টাকা করে ৩ মাসের টাকা কম দিয়ে। এদিকে এ বিষয়ে আমাকে কিছুই আগে বলেননি তিনি। পরে আছগর ভাইয়ের সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়। আমি বলেছি তিনি এরকম অন্যের হক মারলে উমরাহ বা কোনো ইবাদত কবুল হবে না। এরপর আমাকে বলা হয় উনারা অন্য আরেকজন ঈমাম রাখবেন, বেশি বেতন দিয়ে রাখবেন। আমি যাতে অন্যত্র চাকরি খুজি, এমনকি হুট করে আমাকে না করে দেন।”
অভিযুক্ত ফুয়াদ আহমদকে ফোন করে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি ক্ষেপে যান। তিনি বলেন, ওই ঘটনার এতোদিন পর কেন কথা বলছি এ বিষয়ে। তিনি বলেন, এই মসজিদের কোনো দায়িত্বে আমি নেই। আমাদের ফ্যামিলিগত ভাবে এটা চলে। মোতোয়াল্লি পরিচালিত মসজিদ এটি। মোতোয়াল্লি আমার চাচাতো ভাই আছগর এবং সবকিছু আমার চাচাতো ভাইয়েরা লন্ডন থেকে চালান আর আমরা দেখা-শুনা করি। মসজিদের ঈমাম হাফেজ মাসুমকে কিভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা।” জিজ্ঞাসা করা হয় লন্ডন থেকে কি চাকরিচ্যুত করা হয়েছে? জবাবে তিনি বলেন, “না ভাই, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা।” এদিকে জামায়াতের কর্মীর বিষয়টি স্বীকার করেন ফুয়াদ। তাছাড়া মসজিদে হাফেজ মাসুমের সাথে খারাপ ব্যবহার করার বিষয়টি তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেন।
মসজিদের মোতোয়াল্লি আছগর মিয়া ফোন ধরেই বলেন, আমি এই মসজিদের মোতোয়াল্লি, কোনো বক্কর-ছক্কর করার সুযোগ নেই। আমি ২৪-২৫ বছর ধরে মসজিদ পরিচালনা করি। আমি বুঝেছি আপনি কেন ফোন করেছেন। এই ভেজালে আপনি ঢুইকেন না ভাই। হাফেজ মাসুম ভাইকে আমিই ৫ বছর রেখেছি, ভালোমন্দ মিলিয়ে এতোদিন থেকেছেন, অন্য কেউ হলে ১ বছরও রাখতো না। জামায়াতের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি জামায়াত করি, ৯ নং ওয়ার্ডের আওতায় এ মসজিদ। মসজিদের দায়িত্ব আমার চাচাতো ভাইয়েরা আমাকে, মুর্শিদকে ও ফুয়াদকে দিয়েছেন। ঈমাম সাহেব ব্যবসা করেন, গাছে ওঠে মধু ভাঙেন, মসজিদে সময় দেন না, মসজিদের কাজ-কাম করেন না, আমাদের ভালো লাগেনি তাই উনাকে বাদ দিয়েছি। মুসল্লীদেরও নানান অভিযোগ আছে উনার ব্যাপারে।
এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মুসল্লী আব্দুস সবুর বলেন, আমি নামাজে ছিলাম। আমি যদ্দুর জেনেছি, মাসুম ভাইকে জামায়াতের প্রোগ্রামে ইনভাইট করেছেন ফুয়াদ ভাই। মাসুম ভাই যেতে অস্বীকৃতি জানালে উনাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। মসজিদে উচ্চ স্বরে কথা না বলার জন্য বললে একজন ভাইকে ধাক্কাও মেরেছেন ফুয়াদ ভাই।
দ্বারক মসজিদের তখনকার মুয়াজ্জিন তামজিদ রাজা বলেন, আমি নামাজ থেকে বের হয়ে দেখি ঈমামের সাথে ফুয়াদ ভাই তর্কাতর্কি করছেন। এক পর্যায়ে এ বিষয়ে একজন ভাই জড়ালে উনাকে ধাক্কা দেন ফুয়াদ ভাই, বাজে ব্যবহার করেন। উনার ব্যবহার গুলা ঠিক নয়। এরপর কিছু মানুষ জড়োও হয়।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী আদিব ট্রাভেলসের মালিক বসর আলী খান বলেন, “ওইদিন জামায়াতের প্রোগ্রাম ছিল। দ্বারক মসজিদের ফুয়াদ ঈমাম সাহেবকে ফোন করছিলেন প্রোগ্রামে কোরআন তেলাওয়াত করার জন্য। ঈমাম সাহেব বলেছেন আমার অন্যান্য কাজ আছে তাই আমি যেতে পারবো না। ওইদিন আসরের নামাজের পর বারিন্দায় ফুয়াদ ঈমামকে ধমকি দিয়ে কথাবার্তা বলছেন। তখন আমি সামনেই ছিলাম। একজন মুসল্লী বলেছেন, এভাবে চিল্লাচিল্লি করতেছেন, নামাজে ডিস্টার্ব হচ্ছে। তখন ফুয়াদ মুসল্লীকে ধমক দেন। তখন আমি ফুয়াদকে বলি, “এগুলা কি শুরু করছেন। খারাপ ব্যবহার করছেন, নামাজে ডিস্টার্ব করতেছেন, এই অধিকার কে তোমাকে দিল?” তখন ফুয়াদ বলেন, আমি মসজিদের দায়িত্বে আছি, মসজিদের কাজেই কথা বলছি।” আমি প্রতিত্তোরে বলেছিলাম তাইলে বাইরে গিয়ে কথা বলেন, মসজিদে কেন? মানুষকে ডিস্টার্ভ কেন করছেন? এরপর আমার সাথে ধাক্কাধাক্কি শুরু করেছে ফুয়াদ। তখন অন্যান্য মুসল্লীরা আমাকে ও ঈমামকে বলেন, সে (ফুয়াদ) খারাপ লোক, তার সাথে তর্কে যাইয়েন না। আমি চলে আসি এবং পরে জেনেছি ঈমামকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।”
ভুক্তভোগী ইমাম এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন এবং পূর্বের মুয়াজ্জিন থাকায় বর্তমানে মসজিদটিতে নতুন কোনো স্থায়ী ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
