দুপুর ঠিক ১২টা। ইসকন যুগলটিলা সিলেট মন্দির থেকে সারিঘাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু। গন্তব্য লালাখাল চা-বাগান। সেখানে গীতা কোর্সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা। সঙ্গে ছিলেন ইসকন সিলেট ভক্ত কল্যাণ ও আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগের বিভাগীয় সদস্য পরমেশ্বর কৃষ্ণ দাস, ইসকন সিলেট নামহট্টের অন্যতম প্রচারক চৈতন্য দাস ব্রহ্মচারী, ইসকন সিলেট মন্দিরের কমান্ডার দেবেন্দ্র কেশব দাস ব্রহ্মচারী।
উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়া, তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া। কিন্তু দিন শেষে মনে হলো, এই যাত্রা শুধু একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পথ, প্রকৃতি, নদী, চা-বাগান আর মানুষের সঙ্গে কাটানো সময় মিলে তৈরি করেছে আলাদা এক দিনের গল্প।
শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে গাড়ি যত এগোতে থাকল, চারপাশের দৃশ্য ততই বদলে যেতে লাগল। কংক্রিটের জায়গা নিল সবুজ। কোথাও বিস্তীর্ণ মাঠ, কোথাও গাছপালায় ঘেরা পথ, আবার কোথাও আঁকাবাঁকা সড়কের দুই পাশে গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা।
গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া ছিল। তবু পথের কোনো কোনো দৃশ্য চোখে পড়লেই মনে হচ্ছিল, একটু থেমে দেখি। ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়তে থাকল রাস্তা, সবুজ আর একসঙ্গে চলার মুহূর্তগুলো।
লালাখাল চা-বাগানে পৌঁছে ভিন্ন এক পরিবেশ। সেখানে অপেক্ষা করছিল গীতা কোর্সের শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণের আয়োজন ছিল দিনের মূল কর্মসূচি।
গীতা শেখার মতো একটি ধারাবাহিক শিক্ষামূলক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে পুরস্কার বিতরণ নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তাদের আগ্রহ ধরে রাখারও একটি উপায়। শিক্ষার্থীদের মুখের আনন্দ, আয়োজকদের ব্যস্ততা এবং সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বাগান প্রাঙ্গণে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।
অনুষ্ঠান শেষে মনে হলো, গন্তব্যে আসার মূল কারণটি পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দিনের গল্প তখনও শেষ হয়নি।
বিকেলে অনুষ্ঠান শেষ করে সবাই মিলে নদীর তীরে যাওয়া। সামনে পিয়াইন নদী। নীলাভ জল, দূরের পাহাড়, খোলা আকাশ আর নদীর পাড়—সব মিলিয়ে মুহূর্তেই বদলে গেল পরিবেশ।
নৌকায় ওঠার আগে সবাইকে নিয়ে ছবি তোলা হলো। দিনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এ সময়টুকু ছিল একেবারেই নিজের মতো। কারও মুখে হাসি, কারও চোখ নদীর দিকে, আবার কেউ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে স্মৃতির অংশ হয়ে গেলেন। সারাদিনের ব্যস্ততার মধ্যে নদীর তীরে এই কয়েকটি মুহূর্ত যেন বাড়তি পাওয়া।
ফেরার পথে বাগানের ভেতর দিয়ে আসার সময় আবার চোখে পড়ল সবুজের অন্য রূপ। চা-বাগানের সারি, পথের দুই পাশের গাছপালা এবং প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি।
কিছু ছবি তখনও তোলা হলো। নদীর তীরে নৌকায় ওঠার আগের ছবি আর বাগানের ভেতর দিয়ে আসার সময়ের ছবিগুলো পরে দিনের স্মৃতিকে আরও পূর্ণ করে দিল।
ফেরার সময় সঙ্গে ছিল কিছু স্থানীয় সবজি। সবাই যার যার পছন্দমতো সেসব সবজি কিনে নিলেন। খুব সাধারণ একটি ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যেও ছিল স্থানীয় মানুষের জীবন ও উৎপাদনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আনন্দ।
ভ্রমণের পথে এমন ছোট ছোট ঘটনা কখনো কখনো বড় স্মৃতি হয়ে থাকে।
ফেরার সময় সারিঘাট পেছনে পড়ে গেল। কিন্তু নদীর নীল জল, নৌকায় ওঠার আগের মুহূর্ত, চা-বাগানের সবুজ, গীতা শিক্ষার্থীদের আনন্দ আর স্থানীয় সবজি কেনার দৃশ্যগুলো থেকে গেল স্মৃতিতে।
একটি সফর শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর নাম নয়। পথের দৃশ্য, মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতির কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়ানো—সবকিছু মিলেই একটি ভ্রমণ পূর্ণতা পায়।
২৬ সেপ্টেম্বরের সেই শনিবার তাই শুধু একটি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের দিন নয়; এটি হয়ে রইল পথ, প্রকৃতি, মানুষ ও স্মৃতিতে আঁকা সারিঘাটের একটি সুন্দর দিন।
সিদ্ধ মাধব দাস
কলামিস্ট ও যোগাযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক, ইসকন সিলেট।

