মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য হলো মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এটি এক নতুন জীবনের সূচনা। দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী যে জীবন, তাকে বলা হয় আলমে বরজখ। এখানেই শুরু হবে মানুষের প্রথম হিসাব। কবর হবে হয় জান্নাতের বাগান, নয়তো জাহান্নামের একটি গর্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।অতঃপর তোমাদেরকে আমাদের কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৫৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কবর হয় জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান, অথবা জাহান্নামের গর্তসমূহের একটি গর্ত।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬০)
কবরের প্রশ্ন, কবরের নেয়ামত ও শাস্তি—সবই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদার অন্তর্ভুক্ত। তবে আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে কবরে কয়েক শ্রেণির সৌভাগ্যবান মানুষকে প্রশ্ন করা হবে না।
তারা হলেন—
১. সীমান্ত পাহারাদার (মুরাবিত)
রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তিনি মৃত্যুর পরও তার নেক আমলের সওয়াব পেতে থাকেন এবং কবরের পরীক্ষার সম্মুখীন হন না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সীমান্ত পাহারা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে যে আমল করছিল তা কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য অব্যাহত থাকবে। তার রিজিকও জারি থাকবে, সে কবরের পরীক্ষার ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে এবং কিয়ামতের ভয় থেকেও নিরাপদ অবস্থায় উঠবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৭৬৭)
২. শহিদ
শহিদের মর্যাদা ইসলামে অতুলনীয়। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর বিশেষ রহমতের অন্তর্ভুক্ত হন। কবরের প্রশ্ন ও আজাব থেকেও তিনি নিরাপদ থাকবেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘শহিদের মাথার উপর তরবারির ঝলকই তার জন্য কবরের ফিতনা থেকে মুক্তির জন্য যথেষ্ট।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২০৫৩)
৩. পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী
যারা দীর্ঘদিন পেটের কঠিন রোগে ধৈর্যসহকারে কষ্ট ভোগ করে মৃত্যুবরণ করেন, তাদের জন্যও সুসংবাদ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেটের রোগে মৃত্যুবরণ করবে, তাকে কবরে আজাব দেওয়া হবে না।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৬৪)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (স.) আরো বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ছাড়াও আরো সাত ধরনের শহিদ রয়েছে—মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, পার্শ্বব্যাধিতে মৃত ব্যক্তি, পেটের রোগে মৃত ব্যক্তি, আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং গর্ভাবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১১১)
এটি আল্লাহর অসীম দয়ারই প্রকাশ যে, কঠিন রোগে ধৈর্যধারণকারীদের তিনি বিশেষ প্রতিদান দান করেন।
৪. নিয়মিত সুরা মুলক তিলাওয়াতকারী
সুরা মুলককে হাদিসে কবরের শাস্তি থেকে রক্ষাকারী সূরা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোরআনে ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা রয়েছে, যা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। সেটি হলো ‘তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলক’।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯১)
তাই প্রতিদিন বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে সুরা আল-মুলক তিলাওয়াত করার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
৫. জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারী
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য বরকতময় দিন। এ দিনে মৃত্যুবরণকারীদের ব্যাপারেও বিশেষ সুসংবাদ এসেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে মুসলমান জুমার দিন অথবা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তাকে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপদ রাখবেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১০৭৪)
তবে মনে রাখতে হবে, এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের সুসংবাদ। কারো জন্য গুনাহ করার অবকাশ বা নিশ্চিন্ত থাকার কারণ নয়। একজন মুমিনের উচিত সর্বদা তাকওয়া ও নেক আমলের ওপর অবিচল থাকা।
আরো যাদের সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়
আলেমদের আলোচনা ও বিভিন্ন বর্ণনায় নবী-রাসুলগণ, সিদ্দীকগণ, নাবালেগ শিশু এবং শরিয়তের দায়িত্বমুক্ত (যেমন মানসিক ভারসাম্যহীন) ব্যক্তিদের ব্যাপারে কবরের আজাব বা প্রশ্ন থেকে অব্যাহতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে সব বর্ণনার মান সমান নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সহিহ বর্ণনাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে কথা বলা উচিত।
আমাদের করণীয়
কবরের প্রশ্ন থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা লাভের জন্য শুধু কোনো একটি আমলের ওপর নির্ভর না করে একজন মুসলমানের উচিত—
১. বিশুদ্ধ আকিদা ধারণ করা।
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা।
৩. কোরআন তিলাওয়াত ও আমল করা।
৪. নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
৫. সুরা মুলক পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা।
৬. মানুষের হক আদায় করা।
৭. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নেক আমলে অবিচল থাকা।
কবরের জীবন আখিরাতের প্রথম ধাপ। সেখানে সফলতা অর্জন করতে পারলে পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হবে, আর সেখানে ব্যর্থ হলে পরবর্তী পথ আরো কঠিন হয়ে উঠবে। তাই একজন মুমিনের প্রকৃত প্রস্তুতি হওয়া উচিত দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন নয়, বরং কবর ও আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের ঈমানের ওপর অটল রাখেন, কবরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার তাওফিক দান করেন, কবরের শাস্তি থেকে হেফাজত করেন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন। আমিন।
