যেভাবে বেঁচে দেশে ফিরলেন নবীগঞ্জের লুৎফুর রহমান

২৮শে ফেব্রুয়ারি। চারদিকে বিস্ফোরণের শব্দ। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলো যুদ্ধবিমান। মনে হচ্ছিলো, মাটি কেঁপে উঠছে। কারখানার কিছু দূরের একটি ভবনে হঠাৎ বোমার বিস্ফোরণ। বন্ধ হয়ে গেছে ইন্টারনেট সংযোগ। দেশে পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছি না। কোনোকিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বের হওয়ারও সুযোগ নেই। লাগাতার হামলা চলছে। মানুষ মারা যাচ্ছে। বাইরে যেতে নিষেধ। খাবার নাই। শুধু রুটি খেয়ে কেটে যায় দিন। এভাবেই ইরানের যুদ্ধে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর কায়স্থগ্রামের ছুরুত মিয়ার পুত্র লুৎফুর রহমান। বছর পাঁচেক আগে জীবিকার সন্ধানে যান ওমানে। সেখানে সুবিধা করতে পারেননি। এরপর অবৈধভাবে পাড়ি জমান ইরানে। কাজ নেন দেশটির রাজধানী তেহরানে একটি প্লাস্টিক কোম্পানিতে। সেখানেই একে একে কেটে যায় পাঁচ বছর। এ সময়ে ২টি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয়েছে এই যুবকের। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবারের যুদ্ধে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ২২ দিন কাটিয়ে দূতাবাসের ট্রাভেল পাস নিয়ে আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। মুঠোফোনে লুৎফুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, গত ৫ বছর ধরে ইরানে। এ সময়ে অনেক কিছুই প্রত্যক্ষ করেছি।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি তেহরানেই ছিলাম। হামলার সময় বাসায় শুয়ে ছিলাম। হুট করে বিকট শব্দ। চারপাশে শুধু শব্দই শোনা যায়। কোনোকিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বের হওয়ারও সুযোগ নেই। হঠাৎ কী হচ্ছে তাও বোঝা যাচ্ছিলো না। তবে বড় ধরনের কিছু হয়েছে মাথায় আসছিল। কে হামলা করছে? কেন করছে? প্রথমদিকে বুঝতে পারিনি। আমাদের বাসার অনেকেই তখন বাইরে ছিল। তারা তাৎক্ষণিক ফিরে এসে বলে, পুরো শহর আক্রান্ত। তখন আর বোঝার বাকি নেই। যুদ্ধ। সরকার থেকেও কোনো নির্দেশনা পাচ্ছিলাম না। অন্য কোথাও যাওয়ার মতো জায়গাও নেই। সেদিন রাতটা সবাই একসঙ্গে কাটাই। যার কাছে যা খাবার ছিল তা সংরক্ষণ করে রাখি। সবাই ছিল আতঙ্কের মধ্যে। চারদিকে বিস্ফোরণের শব্দ। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলো যুদ্ধবিমান। মনে হচ্ছিলো মাটি কেঁপে উঠছে। এভাবেই যায় একের পর এক দিন। আমার কারখানার কিছু দূরের একটি ভবনেও বোমা হামলা হয়। এতে বেঁচে ফিরবো কিনা তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। ২০২৫ সালের ইরান-ইসরাইল যুদ্ধেও তেহরানে ছিলাম। তখন খুব বেশি হামলার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এবার ভয়াবহ হামলা করা হয়। হামলায় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে দেশে থাকা পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। মোবাইল নেটওয়ার্কও দুর্বল।

পরদিন জানতে পারি, বাংলাদেশ দূতাবাস তেহরান থেকে সরিয়ে পাশের শহর সাভেহ’তে নেয়া হবে। এ ছাড়াও তেহরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদেরও সরিয়ে নেয়া হবে। মনে একটু আশা জাগে। এরপর দূতাবাসে যোগাযোগ করি। এরই মধ্যে সবার খাবারের মজুত শেষ হয়ে যায়। বাইরে গেলেই দেখি বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশে আছে। রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযুক্ত। এ সময় কিছু রুটি কিনে রাখি। এরই মধ্যে ইরানের পুলিশ বাইরে বের হওয়ায় কড়াকড়ি করে ফেলে। বাইরে বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এর ওপর আবার আমি ছিলাম অবৈধভাবে। সে সময় মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ি। কখন যে মিসাইল এসে পড়ে, মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আবার পরিবারের সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলাম না। এর বাইরে খাবার সংকট। ঠিকমতো খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আবার বাইরে মিসাইলের ভয়। অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। লাগাতার হামলা চলছে। মানুষ মারা যাচ্ছে। খাবার নাই। এদিকে জানি না কবে এখান থেকে বের হতে পারবো। ২রা মার্চ পর্যন্ত কয়েকটি রুটি অবশিষ্ট ছিল। শুধু বেঁচে থাকার মতো খাবার খেয়েছি। পেটে প্রচুর ক্ষুধা। কিন্তু মনে ভয়। মাঝে-মাঝে লড়াই করার শক্তি হারিয়ে ফেলছিলাম। কিন্তু পরিবারের কথা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। এই সময়ে সব দেশের মানুষ চলে যাচ্ছিলো। কেউ নিজের দেশে যাচ্ছে। কেউ নিরাপদ আশ্রয়ে। আমার যাওয়ার জায়গা নেই। কিন্তু আমাকেও যেতে হবে। পরদিন শরীর অনেক দুর্বল হয়ে যায়। মনোবল পুরোপুরি ভেঙে গেছে। কখনো বের হতে পারবো কিনা ভাবতে থাকি। এরই মধ্যে জানতে পারি, সাভেহ শহরের একটি হোটেলে দূতাবাসের অস্থায়ী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য দূতাবাসের কর্মকর্তারা কাজ শুরু করে। তারা অবৈধ বাংলাদেশিদেরও দেশে ফেরার সুযোগ করে দেন। ইরানে অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে থাকেন। আমিও তাদের মধ্যে একজন। তখন একটু আশার আলো পাই।

লুৎফুর বলেন, এরপর তেহরান থেকে দ্রুত সময়ে সাভেহ শহরে যাওয়ার কথাই ভাবতে থাকি। বাংলাদেশি দূতাবাসের সহযোগিতায় সেখানে যাই। এরপর দেশে ফেরার জন্য আবেদন করি। আমাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বেশ বেগ পেতে হয়। সবশেষ মোট ১৮৬ জন ট্রাভেল পাস পাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় ১৯শে মার্চের মধ্যে ট্রাভেল পাস হাতে চলে আসে। দূতাবাস থেকে জানানো হয়, ওইদিন রাতেই আমরা আজারবাইজানে প্রবেশ করবো।

দুপুরের পর ৯টি বাসে আস্তারা সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আগেই সীমান্তের স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মধ্যরাত ২টার দিকে সীমান্তে পৌঁছাই। তবে দেখি, কোনো কর্মকর্তা নেই। ইরানের বন্দর আনজালিতে হামলা হয়েছিল। এ খবর পেয়ে আস্তারা স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা আতঙ্কে পালিয়ে যান। গভীর রাত। তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কনকনে শীত। সবার জন্য এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। এ সময় কেউ বন্দরের ওয়েটিং রুমে, কেউ খোলা আকাশের নিচে আতঙ্কে রাত কাটাই। ঘুমানোর কোনো সুযোগ নেই। গায়ে দেয়ার মতো নেই কম্বল। কোথাও গা ঠেকানোরও সুযোগ নেই। ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় খোলা আকাশের নিচে সবাই বেঁচে থাকার লড়াই করছিল। তিনি বলেন, সকাল ৮টার দিকে স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা এসে কাজ শুরু করেন। তবে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য আলাদা কিছু ফরম পূরণ করতে হয়। এজন্য সেখানে অনেক সময় লেগে যায়। অতিরিক্ত ফরমগুলো পূরণ করি। সবার কাগজপত্র ঠিকঠাক করতে করতে ভোর হয়ে যায়। ভোরেই আজারবাইজানে ঢুকে দেখি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আজারবাইজান ও তুরস্কে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের একাধিক কর্মকর্তা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। এরপর আমাদের গন্তব্য বাকু বিমানবন্দর। বাসেই যাত্রা শুরু। দুপুরের মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছাই। সবাইকে নিয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় একটি বিশেষ ফ্লাইট। অবশেষে ২১শে মার্চ রাত পৌনে ২টার দিকে মাতৃভূমিতে পা রাখি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন