ঝাঁটা দিয়ে নিজেই গা চুলকাচ্ছে গাভী

অস্ট্রিয়ার এক নিভৃত জনপদে প্রায় এক দশক আগে ঘটে যায় এক বিস্ময়কর ঘটনা। স্থানীয় এক অর্গানিক খামারি ও পাউরুটি বিক্রেতা লক্ষ্য করেন যে, তার পোষা গাভী—নাম ভেরোনিকা—অবাধে একটি লাঠি ব্যবহার করে নিজের গা চুলকাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে এই কৌশলে আরও দক্ষ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানানো হয়েছে, গরুর ক্ষেত্রে সরঞ্জাম বা টুল ব্যবহারের এটিই বিশ্বের প্রথম দালিলিক প্রমাণ।

স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন জানায়, ভিয়েনার ইউনিভার্সিটি অফ ভেটেরিনারি মেডিসিনের কগনিটিভ বায়োলজিস্ট অ্যালিস অয়ার্সপার্গ যখন ভেরোনিকার এই আচরণের ভিডিও দেখেন, তিনি বিস্মিত হন এবং সরেজমিনে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।

অয়ার্সপার্গ তার সহকর্মী আন্তোনিও ওসুনা-মাসকারোকে সঙ্গে নিয়ে যান অস্ট্রিয়ার মনোরম শহর ‘নোশ ইম গেইল্টাল’-এ। ওসুনা-মাসকারো শহরটির সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র দ্য সাউন্ড অফ মিউজিক-এর দৃশ্যপটের সঙ্গে তুলনা করে।

ওসুনা-মাসকারোর ভাষায়, ভেরোনিকা ছিল ‘অত্যন্ত বন্ধুসুলভ’। তিনি টানা দুই সপ্তাহ ধরে গাভীটিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং জানান, ভেরোনিকা ও তার মালিক উইটগার-এর মধ্যে সম্পর্ক ছিল ‘অসাধারণভাবে গভীর’।

উইটগার শুধু পাউরুটি তৈরি করতেন না, নিজেই সেগুলো এলাকায় সরবরাহ করতেন। ভেরোনিকা প্রতিটি চলন্ত গাড়ির দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকত—ড্রাইভারটি তার প্রিয় উইটগার কি না, তা বোঝার জন্য। যদি বুঝতে পারত গাড়িটিতে উইটগার আছেন, তবে সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাম্বা রবে ডেকে উঠত।

গত গ্রীষ্মে গবেষক দল ৭০টি ভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করেন, কীভাবে ভেরোনিকা মেঝে পরিষ্কারের একটি ঝাঁটা ব্যবহার করে। বিজ্ঞানের ভাষায় ‘টুল ব্যবহার’ বলতে বোঝায়—নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য সচেতনভাবে কোনো বস্তুকে কাজে লাগানো। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী ভেরোনিকার আচরণ নিঃসন্দেহে টুল ব্যবহারের আওতায় পড়ে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভেরোনিকা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ঝাঁটাটিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সে নিজের জিভ দিয়ে ঝাঁটার হাতল শক্তভাবে ধরে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে চুলকানোর জন্য সেটিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ঘোরায় ও চালনা করে।

এই গবেষণার ফলাফল ১৯ জানুয়ারি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘কারেন্ট বায়োলজি’-তে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় যুক্ত না থাকা জার্মানির রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ফার্ম অ্যানিম্যাল বায়োলজি-এর গবেষক ক্রিশ্চিয়ান নাওরথ বলেন, ‘এই গবেষণা প্রাণীদের টুল ব্যবহারের একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী উদাহরণ তুলে ধরেছে। প্রমাণগুলো অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য।’

গবেষকরা শুরুতে ধারণা করেছিলেন, ভেরোনিকা হয়তো শুধু ঝাঁটার শক্ত ব্রাশ অংশ দিয়েই চুলকাবে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো—শরীরের নরম বা পৌঁছানো কঠিন অংশে পৌঁছাতে সে মাঝে মাঝে ঝাঁটাটি উল্টে হাতলের দিকটিও ব্যবহার করেছে।

প্রথমে এটিকে গবেষকরা ‘ভুল’ ভেবেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি একটি সুস্পষ্ট ও পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন। ওসুনা-মাসকারো জানান, যদিও ভেরোনিকার ব্রাশ অংশ ব্যবহারের প্রবণতা বেশি, তবু হাতলের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত উদ্দেশ্যপূর্ণ ও অর্থবহ।

এখন পর্যন্ত কোনো সরঞ্জামকে একাধিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সক্ষমতা মূলত শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেই দেখা গেছে। তাই গবাদি পশুর মধ্যে এমন আচরণ বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।

অয়ার্সপার্গ বলেন, ‘গরুর মধ্যে এমন জটিল আচরণ দেখা যাবে— এটি আমাদের ধারণার সম্পূর্ণ বাইরে ছিল।’

গবেষকদের মতে, ভেরোনিকা জন্মগতভাবে কোনো ‘অসাধারণ বুদ্ধিমান’ গরু নয়। বরং তার বেড়ে ওঠার পরিবেশই তাকে এই দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করেছে। ওসুনা-মাসকারো ব্যাখ্যা করেন, ভেরোনিকার পরিবার তাকে এমন একটি পরিবেশ দিয়েছে, যেখানে সে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে। তার মালিক তাকে খেলার জন্য লাঠি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম দিতেন—যা সাধারণত অন্য গরুগুলো পায় না।

যদিও ছাগল বা মহিষের সরঞ্জাম ব্যবহারের কিছু বিচ্ছিন্ন গল্প শোনা গেছে, তবে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ এই প্রথম।

গবেষকরা আশা করছেন, ভেরোনিকার এই ঘটনা বিজ্ঞানীদেরকে অন্যান্য অবহেলিত প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করবে।

অয়ার্সপার্গ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা এতদিন এই প্রাণীদের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিইনি। হয়তো একটি গরুর টুল ব্যবহার করা ততটা অস্বাভাবিক নয়— যতটা অস্বাভাবিক আমাদের এই ধারণা যে গরু বুদ্ধিমান হতে পারে না।’

সূত্র: সামার টিভি

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন