পুরো প্রক্রিয়ায় কোথাও ‘ইয়াবা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে ব্যবহার করা হয় সাংকেতিক ভাষা।‘বিচি’, ‘বোতাম’ ও ‘মাল’—এই তিন নামেই চলে যোগাযোগ, দরকষাকষি ও চালান আদান-প্রদান। ফলে প্রকাশ্যে কথোপকথন হলেও তা সাধারণ আলাপচারিতা বলেই মনে হয়। দিনের আলোয় তারা জেলে, আর রাতের অন্ধকারে চোরাকারবারি। সীমান্তবর্তী জনপদের চায়ের দোকান কিংবা বাজারে কেউ খোঁজ নেয় ‘বিচি’র, কেউ জানতে চায় ‘বোতাম’ এসেছে কি না, আবার কারও মুখে শোনা যায় শুধু ‘মাল’ শব্দটি। সাধারণ মানুষের কাছে নিরীহ মনে হলেও এসবই ইয়াবা ব্যবসার সাংকেতিক ভাষা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারত সীমান্তঘেঁষা জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত দেশে প্রবেশ করছে ইয়াবার চালান। পরে বিয়ানীবাজারকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে তা দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চালান ও বাহক ধরা পড়লেও কোটি টাকার এই মাদক ব্যবসার মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের জিরোপয়েন্ট থেকে কসকনকপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত সীমান্ত এলাকা এখন মাদক কারবারিদের কাছে নিরাপদ করিডোর হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তজুড়ে অন্যান্য চোরাচালান ইস্যু আলোচনায় থাকায় ইয়াবা পাচারের বিষয়টি দীর্ঘদিন আড়ালেই ছিল। সেই সুযোগে গড়ে ওঠে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চক্রের সদস্যরা সীমান্তের দুই প্রান্তে ভাগ হয়ে কাজ করে। কেউ সংগ্রহ করে, কেউ সংরক্ষণ করে, কেউ পরিবহন করে, আবার কেউ পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। ফলে পুরো চক্রটি বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সীমান্ত সূত্রগুলো জানায়,নদীপথ, কাঁটাতার ও রাতের অন্ধকারে ইয়াবা পাচারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়
দিনের বেলায় জেলের ছদ্মবেশে নদীতে মাছ ধরার আড়ালে সীমান্তের ওপার থেকে চালান সংগ্রহ করা হয়। গভীর রাতে বিশেষভাবে মোড়ানো প্যাকেট নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যা নির্দিষ্ট স্থানে থাকা সহযোগীরা উদ্ধার করে। অনেক সময় সাঁতার কেটে কিংবা ছোট নৌকায় নদী পার হয়েও আনা হয় চালান।
দেশে প্রবেশের পর সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামের নির্দিষ্ট কয়েকটি বাড়িতে সাময়িকভাবে মজুত রাখা হয় ইয়াবা। পরে তা ধাপে ধাপে বড় কারবারিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এজেন্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রের মতে, বিয়ানীবাজার এখন শুধু গন্তব্য নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত থেকে আসা চালান প্রথমে স্থানীয় সংগ্রাহকদের হাতে পৌঁছায়। পরে বড় ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা বাস, সিএনজি কিংবা অন্যান্য গণপরিবহনে সাধারণ যাত্রীর বেশে দেশের বিভিন্ন স্থানে তা বহন করেন।
অভিযান বা তল্লাশির খবর পেলেই তারা যাত্রাপথ পরিবর্তন, পোশাক বদল কিংবা নতুন বাহক ব্যবহারের কৌশল গ্রহণ করে।
বিচি’, ‘বোতাম’ ও ‘মাল’ সাংকেতিক এই ভাষায় ব্যবহৃত ইয়াবার বিরুদ্ধে চলছে একের পর এক অভিযান চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা, বিদেশি মদ ও নগদ অর্থ উদ্ধার হয়েছে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দুবাগ ইউনিয়নের চরিয়া এলাকা থেকে ১ হাজার ৯৫৫ পিস ইয়াবা, ১০০ গ্রাম গাঁজা এবং একটি মোটরসাইকেলসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়।
৭ মার্চ দুবাগ এলাকা থেকে ৬০ পিস ইয়াবাসহ একজনকে এবং ১২ মার্চ পৌরসভার শ্রীধরা এলাকা থেকে ৫০ পিস ইয়াবাসহ আরেকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
৪ এপ্রিল ফতেহপুর এলাকায় অভিযানে ১ হাজার ৩০০ পিস ইয়াবা, ৬ কেজি গাঁজা, ৬ বোতল বিদেশি মদ ও ২ লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ টাকা উদ্ধারসহ একজনকে গ্রেফতার করা হয়।
৯ এপ্রিল কুড়ারবাজারের খশিরবন্দ হাতিটিলা এলাকা থেকে ২০ পিস ইয়াবা ও ২৫০ গ্রাম গাঁজাসহ একজনকে আটক করা হয়।
এছাড়া ১৫ জুন যাত্রীবাহী বাসে অভিযান চালিয়ে ৯ হাজার পিস ইয়াবাসহ একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর আগে বৈরাগীবাজারের আব্দুল্লাহপুর ত্রিমুখী পয়েন্টে চেকপোস্ট পরিচালনা করে ৫০ পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে আটক করা হয়।
এই বিষয়ে বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ওমর ফারুক বলেন, “গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গভীর রাতেও চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হয়।”
মূল হোতারা অধরা থেকে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “অনেক সময় বাহকরাই গ্রেফতার হয়। তবে তদন্তের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্তের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
বিচি’, ‘বোতাম’ ও ‘মাল’ এই সাংকেতিক ভাষায় ব্যবহৃত মারণব্যাধি ইয়াবার ভয়াল তাবার বিষয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন থেকে যায় এ—অভিযান কি শুধু বাহক ধরাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভেঙে দেওয়া হবে পুরো সিন্ডিকেট?
তাদের দাবি, সীমান্তের রুট নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং অর্থের উৎস শনাক্ত করে মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে জকিগঞ্জ-বিয়ানীবাজার করিডোর আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর নীরবে বিস্তার লাভ করবে মরণনেশা ইয়াবার অদৃশ্য সাম্রাজ্য।
