সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকা গিয়েছিলেন সিলেটের জকিগঞ্জের যুবক মাহবুব সারওয়ার রাজন (২৫)। পরীক্ষা শেষে ট্রেনে করে বাড়ি ফেরার কথা জানিয়ে পরিবারের সঙ্গে শেষবার যোগাযোগ করেন তিনি। এরপর হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যান। দুই দিন ধরে উৎকণ্ঠায় খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের দাশপাড়া এলাকায় রেললাইনের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রহস্যজনক এ মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহত মাহবুব সারওয়ার রাজন জকিগঞ্জ পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গন্ধদত্ত গ্রামের আবুল কালাম (কালু মিয়া) এর ছেলে।
রোববার (১২ জুলাই) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ছবির মাধ্যমে রাজনের মরদেহ শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা। পরে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে পুলিশ হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের দাশপাড়া এলাকার রেললাইনের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সরকারি একটি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে রাজন ঢাকা গিয়েছিলেন। শুক্রবার পরীক্ষা শেষে তিনি উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে পরিবারকে জানান। এরপর থেকেই তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সেটি বন্ধ পান।
নিহতের বড় ভাই মাহবুব হাসান মুন্না জানান, রাজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর পরিবার চরম উদ্বেগে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতাও নেওয়া হয়। রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের দাশপাড়া এলাকায় একটি ঝুপড়ি ঘরের পাশ থেকে স্থানীয়রা একটি মরদেহ উদ্ধার করেছেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি রাজনের বলে শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা।
নিহতের চাচা কামরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, “রাজনের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, সেটি এখনো রহস্যই রয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণের জন্য ঘটনাস্থলে গেছেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময় রাজনের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ায় রোববার দিনের বেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, রাজনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান রাত ২টা ৩০ মিনিটে হবিগঞ্জের বাহুবল এলাকায় শনাক্ত হয়েছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময়ের মধ্যেই তার সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
পারিবারিক সূত্র আরও জানায়, মাত্র আট মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মাহবুব সারওয়ার রাজন। তার অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যুতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এ বিষয়ে জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “নিহতের পরিবারের মাধ্যমে ঘটনাটি জেনেছি। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”
এদিকে, এ ঘটনায় শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেছেন শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই (নি.) মো. রাশেদ পারভেজ ছায়িম।
তিনি জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে। কোনো অপরাধমূলক ঘটনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
চাকরির স্বপ্ন নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া এক তরুণের এমন রহস্যজনক মৃত্যু নতুন করে নিরাপত্তা ও তদন্তের প্রশ্ন সামনে এনেছে। এখন পরিবারের একটাই দাবি—রাজনের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।