একসময় অসংখ্য পুকুর, দিঘি ও জলাশয়ের জন্য পরিচিত ছিল সিলেটের বিয়ানীবাজার। সেই জনপদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। গত দুই দশকে অবাধে পুকুর-দিঘি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন, মার্কেট ও বিভিন্ন স্থাপনা। পরিবেশ আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্বের কারণে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে জলাশয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনের ওপর।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের মতে, বিয়ানীবাজারে জলাশয় ভরাট এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একসময় যে পুকুর-দিঘিগুলো মানুষের পানির চাহিদা পূরণ, মাছের উৎপাদন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেগুলোর অধিকাংশই এখন কংক্রিটের স্থাপনায় রূপ নিয়েছে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই দশকে উপজেলায় প্রায় এক হাজার পুকুর ও দিঘি বিলীন হয়েছে। উপজেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একসময় বিয়ানীবাজারে প্রায় ২ হাজার ২০০টি পুকুর ও জলাশয় ছিল। অপরদিকে, ১৯৯১ সালে মৎস্য অধিদপ্তরের জরিপে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি পুকুর-জলাশয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বর্তমানে দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে এসবের বড় অংশই হারিয়ে গেছে।
জলাশয় বিলুপ্ত হওয়ার ফলে শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পৌরশহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গৃহস্থালি কাজেও পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।
পৌরশহরের ঐতিহ্যবাহী বারোপালের দিঘি এখনও টিকে থাকলেও এর আয়তন ক্রমেই কমছে। অন্যদিকে শহরের বহু পুকুর এখন দখল, দূষণ ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। টিএন্ডটি সড়কসংলগ্ন পুকুরটির চারপাশে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, যা জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগে প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে পুকুর ও জলাশয় ভরাট করছে। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা বা মামলা করলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। এখন পর্যন্ত পুকুর ভরাটের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজিরও খুব কম।
পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক শাহীন আলম হৃদয় বলেন, “যারা পুকুর ভরাট বা পাহাড় কাটার মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, তারা অধিকাংশই প্রভাবশালী। এছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
সুজন বিয়ানীবাজার শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আমান উদ্দিন বলেন, “পরিবেশ আদালত থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল, প্রশিক্ষণ ও কার্যকর আইনি প্রয়োগের অভাব রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী হন না, ফলে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়।”
পরিবেশবিদদের দাবি, বিয়ানীবাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ জলাভূমি, পুকুর ও দিঘি ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নদী, খাল ও ছড়ায় নির্বিচারে বর্জ্য ফেলার কারণে পানি দূষণও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বিয়ানীবাজার পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগে কর্মরত আশরাফুল ইসলাম বলেন, “পুকুর শ্রেণির জমিতে কোনো ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয় না। তবে বিএস খতিয়ানে জমির শ্রেণি পরিবর্তিত থাকলে অনেক ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার কারণে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় রক্ষায় বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি, প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া বিয়ানীবাজারের পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী প্রজন্মকে আরও ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।
