জলসুখার ঘেটুগান

ছবি : সংগৃহীত

প্রচীনকালে জলসুখার ইতিহাসে তাদের নিজস্ব মতাদর্শে তৈরি লোকধারার সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতি পায় ঘেটু গান। যা একসময় সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা বরিশাল সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

জানা যায়, আনুমানিক পৌনে দুইশ বছর আগে কোনো এক প্রেম বিরহের বাস্তবধর্মি ঘটনাকে কেন্দ্র করে জলসুখার বৈষ্ণব আখড়া থেকে এই সংস্কৃতির আবিস্কার হয়। প্রথমে আখড়া বা মন্দির কেন্দ্রিক কোনো বৈচিত্র বিনোদন হলেও পরবর্তিতে উন্মোক্ত ভাবে এর বিস্তার ঘটে। ধিরে ধিরে জনপ্রিয় হয়ে উঠলে ঘেটু গান মুসলমান সম্প্রদায়ও গ্রহন করে নেয়।

পল্লি গায়ের এই সংস্কৃতিতে আকর্ষণীয় বিষয় ছিলো কিশোর! যাকে লম্বা চুল কানে দুল হাতে বালা সহ আলতা রাঙ্গা করে অবিকল কিশোরী সাজিয়ে গানের আয়োজন করতো ঘেটু দল। হাওর বেষ্টিত এলাকার লোকজন বর্ষার মৌসুমে হাতে কাজ না থাকায় এই সময়টাতে ঘেটু গানে মজা লুটে আনন্দ উদযাপন করতো । উঠতি বয়সি তরুণ কে কিশোরী সাজে নাচ-গানে অর্থ উপার্জন করার সহজ পন্হা হিসেবে ঘেটু গানকেই বেচে নেয় ওই অঞ্চলের মানুষ।

হত দরিদ্র পরিবারের লোকেরা নিজের সুশ্রী কিশোর ছেলেকে নির্দিষ্ট মেয়াদে বিক্রি করে দিতো ঘেটুদলের কাছে। আবার কেউ কেউ ঘেটু গানের কথা শুনলে লাঠি দ্বারা কিশোরদের দৌড়ানোর কথাও শুনা যায়। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ঢোল তবলা বাঁশি, সারিন্দা ,মন্দিরা করতাল ,হারমোনিয়াম ছিলো ঘেটু গানের সরঞ্জাম। ভরা বর্ষার মৌসুমে বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে নৌকা ভিড়ায়ে এই আয়োজন হতো বলেই ঘাট শব্দ থেকে ঘাটু আর ঘাটু থেকেই ঘেটু শব্দের উৎপত্তি হয়।

একটা সময় বিনোদনের এই সংস্কৃতিতে অশ্লীলতা ঢুকে পড়ে। সমকামি যৌনাচারের মতো জঘন্য কাজের দিকে ধাবিত করে সমাজকে।

জলসুখার কোনো এক জমিদারের বাড়িতে খুব জাঁকজমক ভাবে ঘরোয়া আয়োজন হতো ঘেটুগানের। ক্ষমতাসীন এই জমিদারের ঘেটু আয়োজনের ঘটনাবলির অবলম্বনে চিত্রনাট্য ঘেঁটুপুত্র কমলা তৈরি করেন বাংলাদেশের খ্যাতমান কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ।

বর্তমান সময়ে এই লোকধারার সংস্কৃতির প্রচলন নেই এটি বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগেই। তবে জলসুখার এই আবিস্কৃত সংস্কৃতি বিলুপ্ত হলেও সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে ঘেটুগান ইতিহাস হয়ে থাকবে।

আকতার সাদিক চৌধুরী
সাংবাদিক

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন