হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বদলপুর ইউনিয়নের দিগলবাগ গ্রামের ৪৭ নং দিগলবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জরাজীর্ণ ভবনে প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিদ্যালয়ের প্রতিটি কক্ষই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দেওয়ালের বিভিন্ন অংশ ফেটে গিয়ে নিয়মিত পলেস্তারা খসে পড়ছে। একাধিক স্থানে বিম ও পিলারের রড উন্মুক্ত হয়ে আছে, যা ভবনের স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর শঙ্কা তৈরি করেছে।
সামান্য বৃষ্টিতেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে শ্রেণিকক্ষে, ফলে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে যায় এবং পাঠদান ব্যাহত হয়।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে তিনটি শ্রেণিকক্ষ ও একটি অফিস কক্ষ নিয়ে নির্মিত হয়। ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হলেও এরপর আর কোনো উল্লেখযোগ্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১০৮ জন শিক্ষার্থী ও চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মরত থাকলেও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
সহকারি শিক্ষিকা কাকুলী রানী চৌধুরী বলেন, প্রতিটি কক্ষই ঝুঁকিপূর্ণ। হঠাৎ করে ওপর থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। সবসময় আতঙ্কে থাকতে থাকি আমরা।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী অঙ্কিতা রাণী চৌধুরী জানায়, ক্লাসে বসে পড়াশোনা করা যায় না। বিমের রড দেখা যায়। বৃষ্টির সময় পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়।
আরেক শিক্ষার্থী জানায়, মাঝে মাঝেই পলেস্তারা তাদের শরীরের ওপর এসে পড়ে যা শিশুদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
শিক্ষকদের ভাষ্য, ভবনের এই ভয়াবহ অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থায়ী ভীতি তৈরি হয়েছে। ফলে তারা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে এবং শিক্ষা কার্যক্রমের মানও নেমে যাচ্ছে।
অভিভাবক প্রসেনজিৎ দাস বলেন, দুর্ঘটনার ভয় আছে। তাই আমার দুই সন্তানকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ রেখেছি।
আরেক অভিভাবক জানান, সম্প্রতি বিদ্যালয়ে একটি পূজা অনুষ্ঠানের সময় ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে একজন আহত হন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী বলেন, গত কয়েক বছর ধরে নতুন ভবনের জন্য আবেদন করে যাচ্ছি, কিন্তু কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আগেই বিভিন্ন দফতরে জানানো হয়েছে। আমি পরিদর্শন করে একই অবস্থা দেখেছি। ছাদ ধসে পড়ছে, বিম ও কলামে ফাটল রয়েছে। নতুন ভবনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মনোযোগী হয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ নেই। প্রায়ই বালি, সিমেন্ট ও পলেস্তারা খসে পড়ছে, যা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
এদিকে, বৃষ্টি হলেই অভিভাবকরা ছুটে এসে সন্তানদের বাড়ি নিয়ে যান। পরে বৃষ্টি থামলে শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের আবার স্কুলে এনে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এটি শিক্ষকদের দায়িত্ববোধের পরিচয়, তবুও একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এমন পরিস্থিতি চরম অব্যবস্থাপনারই প্রমাণ।
সচেতন মহলের কয়েকজন বলেন, দিগলবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুর্বলতার এক বাস্তব চিত্র। যেখানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা, সেখানে শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর ফলে শুধু দুর্ঘটনার আশঙ্কাই নয়, শিক্ষার মানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
