- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ভিসা প্রদান স্থগিতের নীতি বাতিল

বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ভিসা দেওয়া স্থগিত রাখার ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাতিল করে দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। আদালত বলেছেন, জাতীয়তার ভিত্তিতে ঢালাওভাবে অভিবাসন ভিসা বন্ধ করে দেওয়ার এ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অভিবাসন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন।

স্থানীয় সময় শুক্রবার (২১ আগস্ট) নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক জিনেট ভার্গাস এ রায় দেন। এর ফলে জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসন ভিসা স্থগিতের নীতিটি বাতিল হয়ে গেল। আদালতের রায়ে নীতিটিকে ‘স্পষ্টতই বেআইনি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

বিচারক ভার্গাস বলেন, জাতীয়তার ভিত্তিতে আবেদনকারীদের অভিবাসন ভিসা দেওয়া থেকে ঢালাওভাবে বিরত থাকার নীতি ফেডারেল অভিবাসন আইনের কাঠামোর সরাসরি লঙ্ঘন। কারণ, কোনো আবেদনকারী অভিবাসন ভিসার জন্য যোগ্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব কনস্যুলার কর্মকর্তাদের ওপরই আইনগতভাবে ন্যস্ত।

আদালত আরও বলেছে, কংগ্রেস অভিবাসন ভিসার আবেদন যাচাই ও যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু নতুন নীতির মাধ্যমে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা বা অন্যান্য নির্ধারিত মানদণ্ড বিবেচনা না করে শুধু জাতীয়তার ভিত্তিতে ভিসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বিচারকের মতে, এটি প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

মূলত মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে অভিবাসন ভিসার আবেদন যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার কর্মকর্তারা। একজন আবেদনকারী ভিসার জন্য নির্ধারিত আইনগত শর্ত পূরণ করছেন কি না, সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সাধারণত ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আদালতের রায়ে এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক যাচাই প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসন ভিসা প্রদান স্থগিত করে। ওই নীতির আওতায় বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও উরুগুয়ে, বলকান অঞ্চলের বসনিয়া ও আলবেনিয়াসহ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকরা পড়েন। নীতিটি ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের যুক্তি ছিল, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর কিছু অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। সেই আশঙ্কার ভিত্তিতেই ভিসা প্রদান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে আদালত মনে করেছে, এ ধরনের সাধারণীকরণ করে একটি দেশের সব নাগরিকের ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করা আইনসম্মত নয়।

এই নীতির বিরুদ্ধে অভিবাসন অধিকারকর্মী সংগঠন, ভিসা আবেদনকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নাগরিকদের একটি পক্ষ আদালতে মামলা করে। মামলাটিতে অভিযোগ করা হয়, জাতীয়তার ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের অভিবাসন ভিসা আটকে দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসন কনস্যুলার কর্মকর্তাদের আইনগত ক্ষমতাকেও কার্যত পাশ কাটিয়ে গেছে।

মামলাটি পর্যালোচনা করে বিচারক জিনেট ভার্গাস নীতিটি বাতিলের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ভিসা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তির আবেদন কেবল তার জাতীয়তার কারণে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নেই। এ সিদ্ধান্তকে আদালত মার্কিন অভিবাসন আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্ধারিত আইনগত ক্ষমতার বাইরে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেছে।

বাংলাদেশিদের জন্য আদালতের এ রায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া স্থগিতাদেশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে অভিবাসন ভিসার আবেদন করা বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি বড় অংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিলেন।

তবে আদালতের রায় ভিসা আবেদনকারীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং জাতীয়তার ভিত্তিতে ঢালাও স্থগিতাদেশের বাধা সরিয়ে দিয়ে আবেদনকারীদের নির্ধারিত আইন ও ব্যক্তিগত যোগ্যতার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পথ খুলে দিয়েছে। ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য আইনগত শর্ত ও কনস্যুলার যাচাই-বাছাই যথারীতি প্রযোজ্য থাকবে।

এদিকে, আদালতের রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়েও নজর রয়েছে। ফলে বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য রায়টি স্বস্তির বার্তা দিলেও ভিসা প্রক্রিয়া বাস্তবে কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতের এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় ব্যক্তির যোগ্যতা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নীতিকে পুনরায় সামনে এনেছে। একই সঙ্গে জাতীয়তার ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে অভিবাসন ভিসা স্থগিত করার নীতির বিরুদ্ধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক নজির হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন