জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখতে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই: মুকতাবিস-উন-নূর

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিলেট ইউনাইটেড জার্নালিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই অর্জনকে টেকসই করতে হলে জাতীয় ঐক্য অটুট রাখতে হবে এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেলে নগরীর জিন্দাবাজারস্থ নজরুল একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং সুধীজন অংশ নেন।

সিলেট ইউনাইটেড জার্নালিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কবীর আহমদ সোহেল-এর সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব ফয়সাল আমীন-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক জালালাবাদ-এর সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূর। প্রধান আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, সিলেটের সভাপতি অধ্যাপক ডা. শামীমুর রহমান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট ইউনিটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি বদরুদ্দোজা বদর, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস)-এর সাধারণ সম্পাদক সেলিম আউয়াল, জাসাস সিলেট জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন তরফদার, বিশিষ্ট চিকিৎসক ও এনডিএফ সিলেট জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হোসাইন আহমদ, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট ইউনিটের সেক্রেটারি মাহবুবুল হক চৌধুরী (ভিপি মাহবুব), সাংবাদিক ও লেখক কবি মুহিত চৌধুরী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজপথের সম্মুখসারির যোদ্ধা, সাবেক ছাত্রনেতা শরীফ মাহমুদ।

সাংবাদিক ও ব্যাংকার রাজু আহমদ-এর পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার এমজেএইচ জামিল। এছাড়া বক্তব্য দেন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শফিক আহমদ শফি এবং সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জালাল আহমদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুকতাবিস-উন-নূর বলেন, শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবসহ দেড় হাজার মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের শক্তির মধ্যে বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি করে ফ্যাসিবাদী অপশক্তিকে পুনরায় মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময় অতিবাহিত হয়েছে। আমরা এখনই হতাশ হতে চাই না। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যকে আরও সুসংহত করবে। তবে প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিষয়ে সরকারকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।”

প্রধান আলোচক অধ্যাপক ডা. শামীমুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনের ফল নয়; এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের ধারাবাহিক পরিণতি।

তিনি বলেন, “প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন। একটি গণতান্ত্রিক সরকার মাত্র ছয় মাস ধরে দায়িত্ব পালন করছে। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। তবে নির্বাচিত সরকারকে ব্যর্থ করা হলে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।”

সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। আমরা জুলাইকে ভুলব না, মুছে দিতেও দেব না। গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন এবং জাতীয় ঐক্য সুসংহত রাখতে জামায়াত যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।”

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছে। তবে দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের রেখে যাওয়া সংকট ও জঞ্জাল দূর করতে সময় প্রয়োজন। তিনি শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবসহ জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের আহ্বায়ক কবীর আহমদ সোহেল বলেন, শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যাসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ করা সময়ের দাবি।

তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের শক্তির মধ্যে বিভক্তি ও সংঘাত সৃষ্টি হলে জাতির অর্জন ও প্রত্যাশা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকতে হবে।”

আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কাউসার আহমদ, সিন্টু রঞ্জন চন্দ, মুনশী ইকবাল, সিলেট ভয়েস ডটকম-এর প্রকাশক সেলিনা চৌধুরী, দৈনিক সবুজ সিলেটের স্টাফ রিপোর্টার সুবর্ণা হামিদ, দৈনিক ভোরের ডাকের সিলেট প্রতিনিধি আব্দুল হান্নান, দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরোর ফটোসাংবাদিক জয়নাল আবেদীন আজাদ, সাংবাদিক মুহিবুর মিসলুসহ বিভিন্ন প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা।

বক্তারা শেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের আদর্শ বাস্তবায়ন, জাতীয় ঐক্য অটুট রাখা এবং একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন