জুড়ীতে হলুদ তরমুজ চাষে খোর্শেদ আলমের সাফল্য

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের লাঠিটিলার ডোমাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা পরিবেশ ও সংবাদকর্মী খোর্শেদ আলম। ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে হলুদ তরমুজ চাষাবাদের শখ জাগে তাঁর। পরীক্ষামূলকভাবে ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো এই তরমুজ চাষ করে সফল হন তিনি। এরপর থেকে আর তাকে পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। ২০২২ সালের পর থেকে প্রতিবছর হলুদ তরমুজ চাষ করে স্থানীয় এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন এ তরুণ উদ্যোক্তা। আর জুড়ীতে প্রথম হলুদ তরমুজের চাষ তিনিই শুরু করেন।

প্রথমবারের মতো চাষ হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে বেশ কৌতুহল ও চাহিদা তৈরি করেছে, যা তার নতুন প্রজাতির ফলন ভালো হওয়ায় লাভজনক হয়েছে। স্থানীয় মানুষজন ও কৃষিপ্রেমীদের কাছে খোর্শেদের এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে।

একসময়ের পতিত পড়ে থাকা বিস্তীর্ণ জমি এবার পরিণত হয়েছে তরমুজের ক্ষেতে। দিগন্তজোড়া এ সবুজ মাঠে বাম্পার ফলন হওয়ায় খোর্শেদ আলমের মুখে ফুটেছে স্বস্তি আর আনন্দের হাসি।

আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জুড়ীর সহযোগিতায় গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নে ডোমাবাড়ি কচুরগুল ব্লকে গত বছরের ১৮ নভেম্বর ৩৩ শতাংশ জমিতে ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ চাষ করেন খোর্শেদ আলম। বর্তমানে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন এ উদ্যোক্তা। নতুন এই প্রজাতির তরমুজ দেখতে যেমন সুন্দর তার স্বাদ ও সুগন্ধি খুব বেশি। এই ফলের ফলন ভালো হওয়ায় ওই এলাকার মানুষের আগ্রহ অনেক। এমনকি এই ফলের চাহিদাও অনেক বেশি। অনেকেই প্রথম এই ফল দেখেছেন এবং খেয়েছেনও। হলুদ তরমুজ দেখতে সিলেট, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে গেছেন। কেউবা বলছেন আগামীতে এই ফসল চাষ করবেন।

সম্প্রতি তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলমের তরমুজের বাগান সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, চারিদিকে বিভিন্ন মানুষের বসতবাড়ি ও গাছের বাগান। এরমধ্যে খোর্শেদ আলমের শখের হলুদ তরমুজের বাগান। ওই বাগান দেখতে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এসেছেন। তারা সবাই ৪-৫টি করে তরমুজ ক্রয় করছেন তাদের পরিবারের জন্য।

এসময় কথা হয় বাংলা সংবাদ এর উপসম্পাদক ও ষাটমা মিডিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবুল কাসেমের সাথে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হলুদ তরমুজের চাষ দেখে নিজের লোভ সামলাতে পারিনি। তাই বড়লেখা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে এসে তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদকে উৎসাহিত করতে এসেছি। তরুণ বয়সে খোর্শেদ যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা চমক লাগানোর মতো। তাঁর চাষকৃত তরমুজ বাগান দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন আসছেন। আমরা আশা করছি, খোর্শেদের মতো অন্যরাও যেন এভাবে তরমুজ চাষে উৎসাহিত হন।

হলুদ তরমুজ চাষকারী তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলম বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই হলুদ তরমুজের চাষ শুরু করি। যদিও ইউটিউব দেখে শখ জাগে। তাই চিন্তা করলাম একবার পরীক্ষা করে দেখি। এরপর সাহস করে বীজ ক্রয় করি। ৬ শতাংশ জায়গায় প্রথমে বীজ বপন করি। আমি এই ফল প্রথমে চাষ করি আমার পারিবারিক চাহিদার জন্য। ফলন ভালো হবার পর এর চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যায়। সেই চিন্তা করে এবার নিজের পতিত প্রায় ৩ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ করি। সেখানে ফলনও ভালো হয়েছে। এ চাষে আমার প্রায় তিন লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি ৫-৬ লক্ষ টাকার তরমুজ বিক্রি করতো পারবো। প্রতিবছর ধান ফলনের পর এই জমি পতিত থাকতো। আমি চেষ্টা করলাম এই জমিতে তরমুজ চাষ হয় কিনা। জুড়ী উপজেলায় হাজার হাজার বিঘা জমি পতিত রয়েছে। সবাই এটা কাজে লাগাতে পারেন এবং যারা শিক্ষিত বেকার আছেন তারা এ উদ্যোগ নিলে অনেক উপকৃত হবেন বলে আশা করি।

তিনি বলেন, এটি শীত মৌসুমের ফসল। মাত্র ৩ মাসেই এর ফলন পাওয়া যায়। জুড়ী উপজেলার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এর চাষাবাদ ব্যাপক হবে এবং নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ আছে বলে জানান তিনি।

জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, ল্যানফাই জাতের তরমুজ চাষ জুড়ীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই তরমুজ দেখার জন্য প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত কৃষকসহ দর্শনার্থী আসছেন। আমরা তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে বলতে চাই খোর্শেদ আলমের মতো যদি এ রকম তরমুজ চাষে কোন বেকার শিক্ষিত যুবক আগ্রহী হয় তাহলে তাকে সফল করতে জুড়ী কৃষি অফিস সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

তিনি বলেন, হলুদ তরমুজ উচ্চমূল্যের ফসল এবং হাইব্রিড জাতীয় সুন্দর একটি জাত। উৎপাদন ব্যবস্থা দেশি তরমুজের মত। হলুদ তরমুজের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেক। এটিতে ভিটামিন এ ও সি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ফলটি অনেক মিষ্টি। জুড়ীর মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী হওয়ায় ফলটি চাষের সম্ভাবনা অনেক।

এ বিষয়ে বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মনোওয়ার হোসেন বলেন, খোর্শেদ আলমের হলুদ তরমুজ চাষের ব্যপারে খোঁজ-খবর নিয়েছি। বিষয়টি জুড়ীতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে জমিতে তরমুজ উৎপাদনের পাশাপাশি মাচায় তরমুজ চাষ করলে নিরবিচ্ছিন্ন ফলন পাওয়া যায়। জুড়ী উপজেলা কৃষি বিভাগের সহায়তা ও মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ এই সাফল্যের মূল কারণ। ভবিষ্যতে আরও নতুন ফসল যুক্ত করে কৃষি সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নেওয়া হবে।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন