চা-বাগান এলাকার দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থার সংকট দ্রুত নিরসনে সরকার সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অভিঘাত সামলে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আজ মঙ্গলবার সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগান মাঠে সিএসআর তহবিলের সহযোগিতায় চা-শ্রমিকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহারস্বরূপ রেইনকোট বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘চা-শিল্পের প্রকৃতি অন্যান্য শিল্পের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। দেশের অনেক বাগান দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে থাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই কেবল মজুরি বৃদ্ধিই শেষ কথা নয়; শ্রমিকরা যেন পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাগানগুলোকে লাভজনক ও টেকসই করার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় ভিত্তিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গত ২০ দিনের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০-৮৫ ডলার থেকে বেড়ে ১০৬ ডলারে পৌঁছেছে। তবে এই আন্তর্জাতিক ধাক্কা সামলাতে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করা হয়েছে। এফএসআরইউর যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে সয়াবিন ও চিনি কারখানাগুলো পূর্ণ উৎপাদনে ফেরায় বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকবে। অসাধু সিন্ডিকেট রুখতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে সারা দেশে যৌথ বাজার মনিটরিং চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে পণ্য ও জ্বালানি পাচার রোধে বিজিবিসহ স্থানীয় প্রশাসন পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
চা-বাগান এলাকার জাতীয় অবকাঠামোগত সংকট কাটানোর বিষয়ে মন্ত্রী জানান, ‘দু-তিনটি বাগান মিলে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু, আধুনিক হেলথ সেন্টার স্থাপন এবং জীর্ণ কাঁচা রাস্তা টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চা-শ্রমিকদের নতুন প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে জেলা প্রশাসন ও ইউএনওদের মাধ্যমে স্থান নির্ধারণ করে নতুন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ধুঁকতে থাকা চা-শিল্পকে চাঙ্গা করতে অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, মসলাজাতীয় ফসল ও টিম্বার চাষের মতো বিকল্প আয়ের পথ তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।’
জাতীয় বেতন কমিশন ও মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয় না হওয়ায় ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, যেন অর্থনীতিতে একবারে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতি না ঘটে। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোকে নতুন করে বেসরকারি বিনিয়োগের আওতায় এনে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণতান্ত্রিক নীতিমালার ওপর জোর দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে গঠনমূলক রাজনৈতিক চর্চা প্রয়োজন। এ সময় তিনি বিরোধী দলগুলোকে কেবল মুখরোচক বক্তব্য না দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা ও জনকল্যাণে কার্যকর পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনূর রুবাইয়াতের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরীসহ প্রশাসন ও চা-বাগানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
