
শহরের এক ব্যস্ত ফুটপাতে টিয়া পাখিকে নিয়ে বসে আছে এক লোক। সামনে সাজানো কয়েকটি খাম। বড় করে লেখা—“মাত্র বিশ টাকা দিয়ে জেনে নিন কে হবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী!”
কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে যায়। ঠিক তখনই হেঁটে যাচ্ছিলেন এক বিএনপির কর্মী। তিনি পকেট থেকে বিশ টাকা বের করে লোকটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন-—আমি জানতে চাই, কে হবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী?
বিশ টাকা হাতে পেতেই টিয়া পাখিটি ঠোঁট বাড়িয়ে একটি খাম তুলে ধরল। খাম খুলে দেখা গেল, ভেতরে লেখা—“যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তাঁর নামের শেষাংশ ‘রহমান’ এবং তাঁর স্ত্রী হবেন ‘ডাক্তার’।”
লেখাটি পড়ে বিএনপির ওই কর্মীর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মনে মনে তিনি নিশ্চিত—তাহলে তো তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন! কারণ নামের শেষে ‘রহমান’ আছে, আর তাঁর স্ত্রীও একজন ডাক্তার।
বিজয়ের হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরে তিনি বিষয়টি শেয়ার করলেন তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে। স্ত্রী শুনেই হেসে বললেন—তোমার ধারণা ভুল। প্রধানমন্ত্রী হবেন ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর নামের শেষাংশও ‘রহমান’, আর তাঁর স্ত্রীও ডাক্তার।স্ত্রীর কথা শুনে লোকটি থমকে দাঁড়ালেন। চোখ-মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল—তিনি চরম কনফিউসড।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু কি তিনি একাই কনফিউসড? জবাব না। আজ পুরো বাংলাদেশই যেন রাজনৈতিকভাবে কনফিউসড।
কারণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন এখন আর শুধু ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে অনুমান, গুজব, আশঙ্কা আর প্রত্যাশার এক বিশাল অনিশ্চয়তার গল্পে। কে আসবেন, কীভাবে আসবেন, আদৌ জনগণের পছন্দই কি শেষ কথা হবে—এই প্রশ্নগুলো আজ ফুটপাথের টিয়া পাখি থেকে ড্রয়িংরুমের আলোচনায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসনের পর বিএনপির নেতা তারেক রহমান দেশে ফিরে এসেছেন। ইতোমধ্যে তিনি দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির ভেতরে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। নেতাকর্মীরা মনে করছেন—এটাই তাদের রাজনৈতিক পুনর্জন্মের মুহূর্ত।
কিন্তু তাঁর ফিরে আসা ঘটেছে এমন এক সময়, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে হওয়া গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্র্বতী সরকার দায়িত্ব নেয়।
এই সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে।ফলে পুরো দেশ এখন এক নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
তারেক রহমানের বয়স ৬০ বছর। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র। রাজনীতিতে তিনি শুধু একজন নেতা নন—তিনি একটি উত্তরাধিকার, একটি পরিবারের ইতিহাস এবং একটি দলের ভবিষ্যৎ।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার আমলে তারেক রহমান রাজনীতিতে বড় নাম হয়ে ওঠেন। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে—স্বজনপ্রীতি,দুর্নীতি,দলীয় আধিপত্যবাদ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং দীর্ঘ ১৭ বছর দেশে ফেরেননি। বিএনপির দাবি ছিল—এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিতর্ক শুধু দেশের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কথায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০১১ সালে উইকিলিকস প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক জেমস এফ মোরিয়ার্টি তাঁকে উল্লেখ করেন—“লুটতরাজমূলক শাসন ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে।এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর প্রবেশ ঠেকানোর সুপারিশও করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচার, জালিয়াতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় সাজার রায় হয়।এর মধ্যে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার মামলাও ছিল, যেখানে অন্তত ২০ জন নিহত হন।
তবে ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়। শেখ হাসিনার পতনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ মামলা স্থগিত বা বাতিল করা হয়।ফলে তাঁর দেশে ফেরার পথ খুলে যায়।
দেশে ফেরার পর চারদিকে একটি কথাই ছড়িয়ে পড়ে—“বিএনপি ক্ষমতায় যাচ্ছে, এবং তারেক রহমানই হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।” মিডিয়াও এমন ইঙ্গিত দিতে থাকে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আচরণেও এক ধরনের সমীহ দেখা দেয়। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার ঢেউ স্থায়ী হয়নি। গত ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন তারেক রহমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারণার পর থেকেই তাঁর জনপ্রিয়তা কিছুটা কমতে থাকে।বিশ্লেষকরা বলছেন—
তারেক রহমান প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে অনেক সময় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ভাষা ও কৌশলের সুরে কথা বলতে শুরু করেন।
বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতকে নতুন করে স্বাধীনতাবিরোধী ট্যাগ দেয়া, হ্যাঁ ভোটের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়া—এসব বিষয় তাঁর জনপ্রিয়তায় চিড় ধরে।মাঠপর্যায়ে বিএনপি নেতা কর্মীদের সহিংসতা ভোটারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
তাদের প্রতিপক্ষের নারী সমর্থকদের হয়রানি ও শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করা বস্ত্র হরণের হুমকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম পিঠিয়ে হত্যা করা, বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের সমর্থক কর্তৃক ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করা। এই বিষয়গুলো তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ মানুষ সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি।
কারণ ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলন তরুণদের রাজনীতিতে এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে—তারা আর পুরোনো সহিংস রাজনীতি দেখতে চায় না। আজ দেশের মানুষ প্রশ্ন করছে—
বিএনপি কি সত্যিই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের বাহক হতে পারবে? তারেক রহমান কি অতীতের বিতর্ক কাটিয়ে নতুন নেতৃত্ব দিতে পারবেন? নাকি ক্ষমতার রাজনীতি আবারও পুরোনো পথে ফিরে যাবে?
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত অভিজ্ঞ, সংগঠিত ও সুশৃঙ্খল দল হিসেবে নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটি তার সাংগঠনিক কাঠামো অটুট রেখেছে। বিশেষ করে দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। ডা. শফিকুর রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং তিনি একজন সমাজসেবক এবং পরিশীলিত বক্তা হিসেবেও পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনা কীভাবে করবে—তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখাও তিনি নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরছেন। ফলে দেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে জামায়াতকে ঘিরে নতুন আশাবাদ ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে, যা অনেকেই “গণজোয়ার” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে জামায়াতের সম্ভাব্য ভূমিকার কথা তুলে ধরছে। আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, ওয়াশিংটন পোস্টসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী গণমাধ্যমে ডা. শফিকুর রহমানকে সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিশ্লেষকরা তুলে ধরছেন—
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে জামায়াত সবচেয়ে বেশি দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। বিচারিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দলটির প্রথম সারির নেতাদের একের পর এক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে জামায়াতের প্রতি সহানুভূতি ও নৈতিক সমর্থন বৃদ্ধি পায়। জামায়াতের প্রার্থীদের বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষিত, পেশাজীবী এবং তুলনামূলকভাবে বিতর্কমুক্ত। তাদের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি বা বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ নেই—যা জনমনে দলটির প্রতি আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দলের মতো জামায়াতে বিদ্রোহী প্রার্থী বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল দৃশ্যমান নয়। দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য জামায়াতকে নির্বাচনী মাঠে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।
২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্ম একটি নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াত ‘২৪-এর চেতনা ধারণ করেছে বলে দাবি করায় জেন-জি ভোটারদের একটি বড় অংশ দলটির প্রতি আস্থাশীল হয়ে উঠছে। তরুণদের সংগঠন এনসিপি, কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এলডিপি জামায়াত জোটে যোগদান, এবং মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদানের ঘটনাগুলো দলটিকে এক অনন্য রাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এসব যোগদান জামায়াতকে শুধু ধর্মভিত্তিক দল নয়, বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত যদি সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে, তবে তারা সরকার গঠন করতে পারে এবং দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করবে বিএনপি, নাকি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—এবং কে হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো অনিশ্চিত। রাজনৈতিক সমীকরণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, জনমত নতুন নতুন মাত্রা নিচ্ছে, আর নির্বাচনী মাঠে প্রতিযোগিতা দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নানা সম্ভাবনা, নানা হিসাব-নিকাশ ও নানা জোটের আলোচনা থাকলেও শেষ বিচারে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি আসে জনগণের কাছ থেকেই। ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, রাজপথের স্লোগান নয়, কিংবা মিডিয়ার বিশ্লেষণ নয়—চূড়ান্ত রায় দেয় ব্যালটের বাক্স।
অতএব আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু একটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি নির্ধারণ করবে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বের গতিপথ এবং গণতন্ত্রের পরবর্তী অধ্যায়। কে উঠবেন রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে, কে হবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী—তা জানতে জাতিকে অপেক্ষা করতে হবে সেই দিনের জনরায়ের প্রতীক্ষায়।
কারণ রাজনীতিতে সম্ভাবনা অনেক, কিন্তু ইতিহাস নির্মাণ করে জনগণের ভোটই।