- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

কোম্পানীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল-যন্ত্রপাতির সংকটে নাজুক স্বাস্থ্যসেবা

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ, অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসক থাকার কথা ৪২ জন, কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন। নার্সসহ অন্যান্য পদেও রয়েছে ব্যাপক শূন্যতা। এর মধ্যে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফসহ পাঁচজন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ এবং জরুরি বিভাগে ১৫০ থেকে ২০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগও সীমিত। আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন না থাকায় এবং এক্স-রে মেশিনটি নষ্ট থাকায় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বন্ধ রয়েছে প্যাথলজি বিভাগও।

হাসপাতালে রেডিওগ্রাফার ও টেকনিশিয়ান না থাকায় কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। ফলে আলট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তাদের।

জনবল সংকটও প্রকট। প্রায় দুই লাখ মানুষের চিকিৎসার জন্য স্থাপিত ৫০ শয্যার হাসপাতালে ৪২ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১১ জন। ২৫টি স্টাফ নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত ৮ জন। এর মধ্যে তিনজন কর্মস্থলে অনুপস্থিত এবং একজন ডেপুটেশনে রয়েছেন। ৩য় শ্রেণির ৪৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত ২০ জন এবং ৪র্থ শ্রেণির ১৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন।

এ ছাড়া দুটি ফার্মাসিস্ট পদই শূন্য। ফলে অফিস সহায়কদের দিয়ে ওষুধ বিতরণের কাজ করাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল সূত্র।

সূত্র আরও জানায়, মেডিকেল অফিসার ডা. শামছুল আবেদীন ২০১৭ সালের ১ মে থেকে অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। বর্তমানে তিনি কানাডায় বসবাস করছেন। এ ছাড়া সিনিয়র স্টাফ নার্স মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে, রুহুল আমীন ২০২২ সালের ৯ মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে, মান্না বেগম ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় এবং মিডওয়াইফ সুবি বেগম ২০২৩ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে কানাডায় অবস্থান করছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি সেবাতেও তৈরি হয়েছে সংকট।

রোগীদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জ্বর, সর্দি-কাশি, পাতলা পায়খানা ও চর্মরোগের মতো সাধারণ রোগের চিকিৎসা মিললেও জটিল রোগের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে সামর্থ্যবান রোগীরা সিলেট শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন। আর দরিদ্র রোগীদের অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে পারছেন না।

চিকিৎসা নিতে আসা স্বপ্না বেগম, মনোয়ারা ও রহিমা বিবিসহ কয়েকজন রোগী বলেন, রোগীর অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ওষুধ নিতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। গরমে অপেক্ষা করাও কষ্টকর। প্রয়োজনীয় ওষুধের বেশিরভাগই বাইরে থেকে কিনতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

রহমত আলী নামে এক সেবাপ্রত্যাশী বলেন, ‘অনেক দূর থেকে ডাক্তার দেখাতে এসেছি। বাইরে বেশি টাকা দিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই। কিন্তু ডাক্তার বলেছেন এখানে চিকিৎসা হবে না, সিলেটে যেতে হবে। আমি গরিব মানুষ, এখন কী করব?’

প্রসূতি সেবার সীমাবদ্ধতা নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন রোগীরা। রাবিয়া বেগম নামে এক সেবাপ্রত্যাশী বলেন, গর্ভাবস্থায় এই হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে পারেননি। জরুরি সিজারের ব্যবস্থাও না থাকায় বাড়তি টাকা খরচ করে বাইরে থেকে সেবা নিতে হয়েছে। পরে নবজাতককে নিয়ে হাসপাতালে এলে শিশু বিশেষজ্ঞ না থাকায় বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আরিফুর রহমান নয়ন বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত তিনজন স্টাফ নার্স ও একজন মিডওয়াইফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আরেকজন মেডিকেল অফিসার অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকায় তাঁকে ওএসডি করে পদটি শূন্য করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জনবল ও যন্ত্রপাতি সংকটের কারণে মানসম্মত সেবা দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আমাদের নতুন একটি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, সিলেটে যন্ত্রপাতি ও জনবল—দুই ধরনের সংকটই রয়েছে। জেলার ১২টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে কোম্পানীগঞ্জে নার্সের সংকট সবচেয়ে প্রকট। প্রয়োজনের এক-চতুর্থাংশ নার্সও নেই। অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দ্রুত তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে পদগুলো শূন্য করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন