সুন্দর এই বিরল পাখিটিকে প্রথম দেখি ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে, রাঙামাটির বরকল উপজেলার শুভলং ঝরনার কাছে। একটি গাছের নিচে আলো-আঁধারিতে পাখিটি ছিল। মানুষের অতিভিড়ের কারণে পাশের খোলা ও আলোময় স্থানে এলো না। এতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও পাখিটির মনের মতো ছবি তুলতে পারলাম না।
লালচে-কালোয় সাদাটুপি লালগির্দিপ্রায় পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালের অক্টোবরে ভুটান বেড়াতে গিয়ে পাখিটির সঙ্গে ফের দেখা। রাজধানী থিম্পু শহরের কাছে রিভারসাইড হোটেলে আমাদের থাকার জায়গা। হোটেলটি রাজধানীর প্রধান নদী ওয়াং চু (বা থিম্পুচু) নদীর তীরে। ভুটান ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন ভোরে হোটেল থেকে বের হয়ে ভোরের ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই শিরশির করে উঠল।
ক্যামেরা হাতে ওয়াং চু নদীর তীরে হাঁটতে লাগলাম। পাথুরে নদী। দূর থেকে পাথরের ওপর গাঙটিটি (River Lapwing) ও বিশ্বব্যাপী অতি বিরল কাস্তেঠুঁটি (Ibisbill) পাখির দেখা পেলাম। মনটা আনন্দে নেচে উঠল।
দ্রুত ওদের কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। নদীতীরের ঝোপঝাড়ে প্রচুর ছোট ছোট শাখাচারী পাখি। তীরে নির্মীয়মাণ রাস্তার জন্য বেশ কিছু বিটুমিনের ড্রাম রাখা ছিল। আমি যখন ঝোপঝাড়ের ছোট ছোট পাখির ছবি তোলায় ব্যস্ত, তখন হঠাৎ করে ড্রামের ওপর লালচে-কালো একটি সুন্দর পাখি নেমে ওর চমৎকার কমলা-লাল লেজটি অনবরত নাড়াতে লাগল। পাখিটির দিকে দ্রুত ঘুরে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে ফোকাস করতেই পাখিটিকে চিনে ফেললাম। শুভলং ঝরনার পাশে এই পাখিটিকেই দেখেছি।
এরও পাঁচ বছর পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পাখিটিকে আবার দেখলাম মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মাধবকুণ্ড ইকোপার্কের ঝরনার পাশে। প্রচুর ছবি তুললাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য হার্ড ড্রাইভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ছবিগুলো হারিয়ে ফেললাম। এ বছরের ২৮ নভেম্বর আবার সুযোগ এলো মাধবকুণ্ড ইকোপার্কে যাওয়ার। সেদিন ‘বার্ডিংবিডি ট্যুরস’-এর সঙ্গে নতুন একটি পাখির ছবি তোলার জন্য ঝরনার পাশে গেলাম। ওখানে গিয়ে সেই আগের জায়গায়ই পাখিটিকে দেখলাম। পাখিটি ঝরনার পাশে পাথরের ওপর ছিল। হেঁটে হেঁটে পাথরের ফাঁকফোকরে ঠোঁট চালিয়ে পোকা খাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে উড়ন্ত পোকা ধরেও খাচ্ছিল, যা দেখার মতো।
রাঙামাটির শুভলং ঝরনা, ভুটানের ওয়াং চু নদীতীর এবং মাধবকুণ্ড ইকোপার্কে দেখা সুদর্শন লালচে-কালো পাখিটি এ দেশের বিরল পরিযায়ী সাদাটুপি লালগির্দি। ইংরেজি নাম White-capped Water Redstart বা White-capped Redstart| এরা মধ্য এশিয়ার (তুর্কমেনিস্তান থেকে ইন্দোচীন পর্যন্ত) আবাসিক পাখি। তবে আফগানিস্তানসহ হিমালয়ের আশপাশের দেশগুলোতেও থাকে। এরা শীতে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিযায়ী হয়। মাসসিক্যাপিডি (Muscicapidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম চযড়বহরপঁত্ঁং ষবঁপড়পবঢ়যধষঁং (ফিনিকিউরুস লিউকোসেফালাস)। সাদাটুপি লালগির্দির দেহের দৈর্ঘ্য ১৮-১৯ সেন্টিমিটার। ওজন ২৪ থেকে ৪২ গ্রাম। একনজরে পাখিটি দেখতে লালচে-কালো। স্ত্রী ও পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য না থাকলেও পুরুষের মাথার সাদা টুপিটি স্ত্রীর তুলনায় আকারে কিছুটা বড়। প্রজননকালে পুরুষের দেহের কালো রং খানিকটা চকচকে দেখায়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথার তালু ছাড়া বাকি অংশ, মুখমণ্ডল, ঘাড়, গলা, বুক, পিঠ, ডানা ও লেজের আগা কুচকুচে কালো। দেহতল, কোমর ও লেজ কমলা-বাদামি। ডানা-ঢাকনির নিচটা কালো এবং তাতে কমলা-বাদামি ফোঁটা। চোখ, ঠোঁট, পা ও পায়ের পাতা কালো। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে বড়গুলোর মতোই, তবে মাথার সাদা টুপিতে কালো রেখা দেখা যায়। তা ছাড়া দেহের কালো রং কুচকুচে নয়, বরং ধূসর-কালো। শীতে এদের চট্টগ্রাম ও সিলেট (বিশেষত মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক) বিভাগের পাহাড়ি পাথুরে নদী, জলধারা ও ঝরনার আশপাশে একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। দিবাচর ও ভূচর পাখিগুলো পাথুরে জলধারার পাশে বা অল্প পানিতে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ শিকার করে খায়। প্রয়োজনে রসালো ফল ও ঘাসের বিচিও খায়। ছড়ানো লেজ ও ডানা বারবার নাচায়। মুখ ওপরে তুলে ‘সিইট-সিইট-সিইট…’ শব্দে ডাকে।
সাদাটুপি লালগির্দি মে থেকে আগস্টে প্রজনন করে। নিজ আবাস এলাকার পাথরের নিচে বা শিলামুখের গর্তে শেওলা, পাতা, শুকনা ঘাস ও পশম দিয়ে বেশ গভীর ও বড় আকারের বাটির মতো বাসা বানায়। এরপর স্ত্রী পাখি তাতে তিন থেকে পাঁচটি গাঢ় দাগযুক্ত ফ্যাকাশে নীল বা নীলচে-সবুজ রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। প্রায় ১৪ দিন তা দেওয়ার পর ডিম থেকে ছানা ফোটে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ছানাদের খাওয়ায় এবং যত্ন করে। আয়ুষ্কাল প্রায় চার বছর।
