লিবিয়া থেকে মৃত্যুপথে ইউরোপ, ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শীর্ষে বাংলাদেশ

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ আর লিবিয়ার মাফিয়াদের কসাইখানা—কোনো ভয়ই থামাতে পারছে না ইউরোপগামী উন্মাদনা। দালালের খপ্পরে পড়ে ভিটেমাটি বেচে তোলা ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা, বন্দিশিবিরে পশুর মতো মারধর, কিংবা মাঝসাগরে ৬ দিন না খেয়ে তিলে তিলে মৃত্যু—সব জেনেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে ইউরোপে প্রবেশের মিছিলে এবারও বিশ্বে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

ইতালির পর এবার গ্রিসের সাগরপথেও নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশি তরুণদের উপস্থিতি। শুধু ইউরোপের ভূমধ্যসাগরই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভয়াল সাইবার স্ক্যাম ক্যাম্পগুলোতেও চাকরির প্রলোভনে বন্দি হচ্ছেন হাজার হাজার যুবক। বছরের পর বছর মামলার পাহাড় জমলেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে পাচারের মূল কারিগররা। এমনই এক বিভীষিকাময় বাস্তবতায় আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস; যার এবারের প্রতিপাদ্য—‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।

এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পালিত হবে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করা দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে গত বছরের মতো এবারও বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে। তবে এবারই প্রথম নয়; গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ এই অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৬ সালে এসে ইতালির পাশাপাশি সাগরপথে গ্রিসে প্রবেশের দিক দিয়েও বাংলাদেশ এখন শীর্ষে রয়েছে, যা নতুন রেকর্ড।

এ বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক থেকে রওনা হওয়া নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয় দিন খাদ্য ও পানিশূন্য অবস্থায় সাগরে ভেসে ছিল।পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়া হয়। এরপরও এমন মৃত্যুযাত্রা থেমে নেই।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি বা গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি হয়ে অসংখ্য বাংলাদেশি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। এত কিছুর পরও ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে লিবিয়ায় যাওয়ার এই প্রবণতা থামছে না।

ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই এভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে গেছেন আরো ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম বলছে, এভাবে ইউরোপে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ বাংলাদেশের অন্তত ১০ থেকে ১২টি জেলার মানুষ এভাবে ইউরোপে যাওয়ার জন্য মরিয়া। এসব ক্ষেত্রে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতারিত বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা দেশে ফিরে মামলা করলেও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবপাচারসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই মানবপাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরনো মামলাসহ ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এসব মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচারের এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত কয়েক বছরে নতুন এক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে সাইবার স্ক্যাম। মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনে যেমন তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তেমনি বাংলাদেশের অনেক মানুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গিয়ে সাইবার স্ক্যামের শিকার হচ্ছেন।

ব্র্যাকের এক গবেষণা বলছে, বিদেশে চাকরির কথা বলে নেওয়া হলেও তাদের ৯৮ শতাংশ কোনো চাকরি পাননি। বরং তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ৯০ শতাংশকে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতিমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ এতে রাজি না হলে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন