উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়ায় গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন, প্রতারণা ও কারাভোগের শিকার হয়েছেন সুনামগঞ্জের বহু তরুণ। গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন সুনামগঞ্জের ৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। একই সময়ে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের মোট ৯৫ জন দেশে ফিরেছেন।
ফেরত আসা এসব তরুণের অনেকেই জমি-জমা বিক্রি, সুদে ঋণ কিংবা ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন পূরণ তো দূরের কথা, লিবিয়ায় গিয়ে অনেকে নির্যাতন, অপহরণ, মুক্তিপণের দাবি, কারাবাস ও দালাল চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। দেশে ফিরে এখন তাদের অনেকের মাথায় লাখ লাখ টাকার ঋণের বোঝা।
ভূমধ্যসাগরে ৬২ ঘণ্টা, এরপর কারাগারে তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল লতিফের ছেলে আল আমিন ২০২২ সালে লিবিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। পর্যটন ভিসায় প্রথমে দুবাই যান। সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থানের পর লিবিয়ায় পাড়ি জমান। প্রায় সাড়ে তিন বছর সেখানে কাজ করেন তিনি।
আল আমিন জানান, কোনো কোনো মাসে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। পরে ভৈরবের এক লিবিয়া প্রবাসী দালালের সঙ্গে সাড়ে ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার চুক্তি করেন। চুক্তির পুরো টাকা দেওয়ার পর একটি বোটে করে তাদের সমুদ্রে পাঠানো হয়।
প্রায় ৬২ ঘণ্টা সমুদ্রে ভাসার পর লিবিয়ার পুলিশ তাদের আটক করে। পরে ওই দালাল পুলিশের কাছ থেকে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে আবারও গ্রিসে পাঠানোর চেষ্টা করেন। দ্বিতীয়বারও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন আল আমিন। এরপর এক মাস পাঁচ দিন কারাভোগের পর আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফেরেন তিনি।
‘মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়’ দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের খেজাউড়া গ্রামের সাইফুল ফজর আলীও এমনই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রায় চার বছর আগে সৌদি আরব ও তুরস্ক হয়ে লিবিয়ায় যান। সেখানে পৌঁছানোর পর দালাল তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। টাকার জন্য ওই চক্র তার ওপর নির্যাতন চালায়।
সাইফুলের ভাষ্য, মাফিয়ার হাত থেকে বাঁচতে দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে দিতে হয়। এরপরও তাকে আরেকটি চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই চক্রটি ‘গেম’ দেওয়ার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দেওয়ার পর সমুদ্রের পাড়ে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। পুলিশের কাছ থেকে মুক্তি পেতেও আরও ৫ লাখ টাকা দিতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পরে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফেরেন সাইফুল।
নির্যাতনের ছবি পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়
জামালগঞ্জের মো. আহাদুল্লাহ জানান, লিবিয়ায় যাওয়ার পর চার মাস পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। ইউরোপে যাওয়ার আশায় এক দালালের সঙ্গে ৮ লাখ টাকায় চুক্তি করেন তিনি। প্রথমে ৩ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়ায় যান।
আহাদুল্লাহ বলেন, বাকি ৫ লাখ টাকার জন্য দালালরা তাকে আটক করে মারধর করে। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। তার কাছে তখন কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। কিন্তু দালালরা দেশে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্যাতনের ছবি পাঠিয়ে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে।
পরিবার তাকে দালালদের কাছে আটক মনে করে নির্যাতনের ছবি দেখে টাকা পরিশোধ করে। অথচ তখন তিনি এরই মধ্যে পালিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান আহাদুল্লাহ।
১৫ লাখ টাকার ঋণ এখন ৩০ লাখ
জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামের আতাউর রহমান বলেন, পাশের ভীমখালী ইউনিয়নের কলকতা গ্রামের নজরুল ইসলামের সঙ্গে চুক্তি করে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে সৌদি আরব, মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান তিনি।
আতাউরের অভিযোগ, লিবিয়ায় যাওয়ার পর ওই দালাল গেমারকে টাকা না দেওয়ায় তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর টাকার জন্য তাকে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে হাসপাতালের চিকিৎসকের সহযোগিতায় দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছান তিনি। এরপর সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় দেশে ফেরেন।
আতাউর রহমান বলেন, লিবিয়ায় যাওয়ার জন্য ১৫ লাখ টাকা সুদে ঋণ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঋণের পরিমাণ এখন বেড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হয়েছে। কিন্তু তার অভিযোগ, দালাল নজরুল ইসলাম কোনো টাকা ফেরত দিচ্ছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের পরিচয় নজরুল ইসলাম হিসেবে নিশ্চিত করেন। তবে আতাউর রহমান নামে কাউকে চেনেন না বলে দাবি করেন। পরে ‘রং নম্বর’ বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
দেশে ফিরেও স্বস্তি নেই
আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফেরা এসব অভিবাসনপ্রত্যাশীর অনেকেই এখন আর্থিক ও মানসিক সংকটে রয়েছেন। বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় পরিবারগুলোও পড়েছে চরম দুশ্চিন্তায়।
সুনামগঞ্জে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের জেলা কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, গত দুই মাসে সুনামগঞ্জের ৬৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। দেশে ফেরার পর তাদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। তাদের পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে ব্র্যাক।
দালালদের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত সিআইডিতে
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, গত কয়েক মাসে এ বিষয়ে ৭ থেকে ৮টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত সিআইডির কাছে পাঠানো হয়েছে। কয়েকটি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ দালাল দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাদের আইনের আওতায় আনতে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করে মামলা করার আহ্বান জানান তিনি। পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে দালালের কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি, ভিসা ও কর্মসংস্থানের কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি। অন্যথায় উন্নত জীবনের স্বপ্ন পূরণের বদলে অনিশ্চয়তা, নির্যাতন ও ঋণের বোঝা নিয়েই দেশে ফিরতে হতে পারে তরুণদের।
