- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

মাদকাসক্ত তরুণ প্রজন্ম: বাংলাদেশের ভয়াবহ ঝুঁকি

সমগ্র বাংলাদেশে আজ তথ্য প্রযুক্তির যুগে তরুণ প্রজন্ম কেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছে একাকিত্বের অন্ধ কারে মাদকাসক্ত অপরাধ, তরুণ তরুণী যুব সমাজ কিছু অংশ, তাদের দেখা দেখি অন্যরা মাদক নিয়ে জীবন তিলে তিলে শেষ করছে যেমন তেমনি প্রতিনিয়ত মাদকাসক্ত অপরাধ বহুমাত্রা অতিক্রম করছে। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের কারাগার গুলোতে বর্তমানে ১ লাখ ৫ হাজার ১২৩ জন বন্দি (হাজতি ও কয়েদি) আটক রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের কারা মহাপরিদর্শকের দেওয়া পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা দেশের মোট ৭৬টি কারাগারের বন্দি ধারণক্ষমতা হচ্ছে ৪৫,১৮৬ জন। অতিরিক্ত বন্দির চাপ বর্তমানে ধারণক্ষমতার প্রায় আড়াই গুণ বেশি বন্দি দেশের বিভিন্ন জেলখানায় অবস্থান করছেন। মোট বন্দিদের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশই মাদক মামলার আসামি। খুন, ছিনতাই অপরাধ জড়িয়ে পরছে মাদকের টাকার জন্য। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাদক আবিষ্কার হচ্ছে। এইতো কিছু দিন পূর্বে রংপুরের মাছুপাড়ায় একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জাতির মেরুদণ্ড যেই শিক্ষকের হাত ধরে এই সমাজের আলোর পথ দেখেছে কতো ছাত্র-ছাত্রী, সেই শিক্ষক পরিবার ৪ জনকে খুন হলো! পুলিশের কথা অনুযায়ী অপরাধী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের রিপোর্টে মাদকের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করার পর রংপুর মেট্রোপলিটন ডিবি পুলিশ এই ফলাফল নিশ্চিত করেছে। এক মাদক সেবী মাদক পান ও সেবন না করলে তাহার শারীরিক মানসিক রোগ থাকে ৪৮ ঘন্টা থেকে ৭২ ঘন্টা। এই মামলার বাদী গণপতি চক্রবতীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, সংবাদিকদের যদি মাদক খেয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটাত, তাহলে তারা নেশাগ্রস্ত থাকত। যেহেতু তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি, তাই এখন তো ভাবা যায় যে সুস্থ মস্তিষ্কে পরিকল্পনামূলকভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একেক সময় একেক রকম তথ্য দিয়ে হালকাভাবে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি শেষ করা যাবে না। পুলিশকে আরও গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে বলেন বাদীপক্ষ। এই সমাজে প্রতিদিনই মাদক নিয়ে কতো ঘটনা ঘটছে। গত ২৯ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব প্রান্তে জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের পর খেজুর বাগানের মুখে সড়কে ছিনতাইয়ের শিকার হন শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। ছিনতাইয়ের সময় রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। সেপ্টেম্বর মাসে ১৮ তারিখ শুক্রবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে নিষ্পাপ শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ পরদিন শনিবার দুপুরে শিশু অপ্রতিম হত্যায় শোকস্তবদ্ধ দেশ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের একটি ঝোপ থেকে অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়া যায়। আইফোনের জন্যই তিন বন্ধু তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল মিলে হত্যা করে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে রাজি হলে তাদের চিন্তাভাবনার জন্য তিন ঘণ্টা সময় দেন আদালত। পরে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। অপ্রতিমের মা একমাত্র ছেলে হারিয়ে মায়ের আজহারী কান্না ময় কন্ঠে, আমি ফাঁসি চাই না, আমি চাই এই দেশটা পুরোটা তলায় যাক! মায়ের ও সাধারণ মানুষের কান্নার আহাজারি কষ্টকর হয়ে উঠে, আমরা সান্ত্বনা দিতে পারব অপ্রতিম পিতা মাতাকে একমাত্র শিশু ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে পারব না। এইতো কিশোরগঞ্জ জালালপুর ইউনিয়ন কুটিয়ারী পাড়ার জন্ম দেয়া পিতা মাতা নেশার টাকা জন্য শিশুকে বিক্রি করে এবং গত তিন বছরে এই ভাবে ৪টি শিশু একই কারণে বিক্রি করে পিতা মাদককের কারনে। সাধারণ জনগণ এক সাংবাদিকের কাছে বলেন, যারা নিজের শিশুকে মাদকের টাকার জন্য বিক্রি করতে পারে তাদের কাছে আমাদের সন্তান তো কতটুকু নিরাপদ? মাদক ধ্বংস করে দিয়েছে পুরো গ্রামটাকে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, মিয়ানমার আমাদের দেশের সীমান্তের পাশে ৬২টা মাদক কারখানা রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি)। সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৮টি সীমান্ত জেলার ১০৫টি প্রধান প্রবেশ পথ বা পয়েন্ট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে সমগ্র বাংলাদেশে ৮টি বিভাগীয় শহর-গ্রামে। তবে প্রশ্ন হলো এই মাদক এক দেশ হতে অন্য দেশ আমাদের বাংলাদেশে কিভাবে এতো মাদক আসছে। এতো আইন কঠিন করে আমরা কেন মাদক ব্যবসায়ী চোরাচালানকারীদের বিচার করে জেল জরিমানা ও সাজা দিয়ে এই ভয়ংকর মাদক বন্ধ করতে পারছিনা তার ব্যর্থতা কার! প্রশাসন নাকি জনগণের এমন দেখা গেছে অনেকবার মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বার বার গ্রেফতার করিলে আইনের ফাঁক ফুঁকে জামিনে এসে পুনরায় আবার মাদকের ব্যবসার সাথে জড়িত হয়। এই সব মাদক ব্যবসায়ী ২০২৫ সালে দেশজুড়ে ৪ কোটি ৩৫ লক্ষ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা বিভিন্ন বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, এসআরবি, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ), কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী। বেশিরভাগ ইয়াবা ট্যাবলেট ও হিরোইন সবচেয়ে বড় চালানগুলো আসে বাংলাদেশে প্রধানত মিয়ানমার সীমান্ত আশেপাশে দিয়ে বিশেষ করে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও নাফ নদী রুট দিয়ে কিছু রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের মাদক ব্যবসায়ীদের যোগসাজসে নিয়ে প্রবেশ করে। আমাদের প্রজন্মা ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মাদক প্রতিরোধ পরিকল্পনা গ্রহণ করার এখন সময়।

সন্তানের মন মানষিক পর্যবেক্ষণ করা, চলাফেরা, জীবনযাপন এবং বন্ধুদের সম্পর্কে জানা, আদর্শ নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা, ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় ও বন্ধুত্ব আচরণ সন্তানের সাথে চলা, সুস্থ বিনোদন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল চিন্তা ধারণা দেওয়া, মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা ও মাদক নিলে শারীরিক, পারিবারিক, সমাজিক, অর্থনৈতিক হতে ক্ষতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, সচেতন করা, খোলামেলা কথা বলা ও পারিবারিক সবাইকে নিয়ে দলীয় আলোচনা করা ও পারিবারিক আলোচনা পারিবারের সুখ দুঃখ উন্নয়ন সকল পরামর্শ গ্রাম পাড়া-মহল্লায় ক্লাব, সমিতি গঠন করে বেকারত্বদের চিহ্নিত করে দক্ষ প্রশিক্ষণ দেয়া। সমাজ সেবায় মন-মানসিকতা তৈরি করা, উরুস গানের আসরে মাদকের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। সীমান্ত এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিতে তদারকি করা এবং ওই এলাকায় কর্মস্থানের ব্যবস্থা করা, গণসচেতনতা সৃষ্টি মাদকের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে সভা, সেমিনারে প্রচার চালানো। এলাকায় চিহ্নিত মাদকাসক্তদের অপরাধী না ভেবে সকলের সহযোগিতায় নিরাময় পূর্ণবাসনে চিকিৎসা দেওয়া পরবর্তীতে তাকে কর্মস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং তাহার সুখ দুঃখে কাছে থাকা কাউন্সিলিং পরামর্শ দেওয়া, ভালোবাসার মাধ্যমে শাসন করা। এলাকায় মাদক কেনাবেচা ও মাদক ব্যবসায়ী পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ দমন করা, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিকভাবে মাদক বিক্রি এলাকায় চিহ্নিত করে সার্বক্ষণিক তদারকি করা, তথ্য প্রযুক্তি দিয়ে মনিটরিং করা, সরকারি আইন শৃঙ্খলার মাসিক মিটিংয়ে উন্মুক্ত আলোচনা ও গোপনীয়ভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য দেওয়া, প্রতিটি জেলায় সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন, সরকারি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, হাই স্কুল, কলেজ, পাঠ্যপুস্তকে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা। টিভি, রেডিও, বেতার অনলাইন, অফলাইনে মাদকের কুফল সম্পর্কে প্রচারণা করা। অবৈধ মাদক তৈরির কারখানা কেমিক্যাল কাঁচামাল আমদানি রপ্তানি নিষেধ করা, কঠোর আইন করে শাস্তি দেওয়া।

লেখক: মাদক সচেতন প্রতিরোধ গবেষক।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন