মাওলানা আব্দুল জব্বার শায়খে লামনীগ্রামী রাহ. পরিচিতি, কমর্ময় জীবন


ভূমিকা:
দ্বীনি অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সিলেট-জৈন্তার গর্ব, আলহাজ্ব মাওলানা শায়খ আব্দুল জব্বার লামনীগ্রামী রহ. ২০২৬ সালের ১১ জুন দিবাগত রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহান রবের ডাকে সাড়া দেন! ইন্না-লিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর এই অপ্রত্যাশিত প্রস্থানে জৈন্তাপুরসহ সমগ্র সিলেট অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে গভীর শোক নেমেছে। আজ অসংখ্য ছাত্র, ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী ও সাধারণ মানুষ তাঁর শূন্যতায় বাকরুদ্ধ।

জন্ম ও পড়ালেখা::
১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী এই মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, তাকওয়া ও আমলের এক অনন্য সমন্বয়। তাঁর পিতার নাম (মৃত) আব্দুর রহমান। মাতার নাম (মৃত) আমেনা খাতুন। ৭ ভাই বোনের মাঝে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ট। শৈশব-কৈশোরের কয়েকবছর দারুল হাদীস মদীনাতুল উলূম খরিলহাট মাদরাসায় লেখাপড়া করেন।পরে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও খ্যাতিমান দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম মইনুল ইসলাম হাটহাজারী থেকে ১৪১৪ হিজরি মোতাবেক ১৯৯৩ ইংরেজিতে মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ পড়ালেখা সম্পন্ন করেন।

কর্ম জীবন::
ইলমে দ্বীনের গভীরতা, প্রখর মেধা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে তিনি সিলেটের, বিশেষত জৈন্তাপুর ও আশপাশের উপজেলার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেমে দ্বীন হিসেবে সর্বমহলে সমাদৃত ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম লামনীগ্রাম মাদরাসার মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব আদায় করেছেন দীর্ঘ ৩৬ বছর। কিছুদিন জামিয়া হুসাইনিয়া গহরপুর মাদরাসায় মুহাদ্দিস ছিলেন।

দ্বীনি নেতৃত্ব ::
তাঁর দক্ষ পরিচালনা, আন্তরিকতা ও স্নেহময় তত্ত্বাবধানে হাজারো ছাত্র দীনি শিক্ষায় আলোকিত হয়েছে। ছিলেন পূর্ব সিলেট কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। অরাজনৈতিক সংগঠন জমিয়তে উলামার কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব। তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর, আদর্শ নির্মাতা এবং উম্মাহর একজন নিবেদিতপ্রাণ খাদেম। হক ও সত্যের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। নাস্তিক্যবাদ, মুরতাদ ও বিভিন্ন বাতিল মতবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন দৃঢ় কণ্ঠস্বর। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা-বিশ্বাস সংরক্ষণ এবং ইসলামের মৌলিক আদর্শ রক্ষায় তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। সত্যের পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ অবস্থান তাঁকে মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

রাজনৈতিক জীবন ::
রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য এবং জৈন্তাপুর উপজেলা শাখার সভাপতি হিসেবে মৃত্যুোব্দি দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্র জীবন পরবর্তী কয়েকবছর তিনি জৈন্তাপুর উপজেলা ছাত্র জমিয়তের সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি শায়খ মাওলানা আব্দুল হামিদ পীরসাহেব মধুপুরের নেতৃত্বাধীন খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ কমিটির সিলেট জেলা শাখার সহ-সভাপতি এবং জৈন্তাপুর উপজেলা শাখার সভাপতি হিসেবে ইসলামের মৌলিক আকীদা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল দ্বীনের খেদমত, মানুষকে আলোর পথে আহ্বান এবং সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার এক অবিরাম প্রয়াস। আজ তাঁর বিদায়ে শুধু একটি পরিবার নয়, একটি জনপদ, একটি প্রজন্ম এবং সমগ্র দ্বীনি সমাজ একজন অভিভাবককে হারালো।

পারিবারিক জীবন:
পারিবারিকভাবে তিনি দাম্পত্য জীবনে যাঈমুল কওম শায়খ মাওলানা হাবিব উল্লাহ ভিতরগ্রামী রাহ, এর নাতিন সাবেরা বেগমকে নিয়ে অত্যন্ত সুখি একটি পরিবার গঠন করেন। রেখে গেছেন স্ত্রী, ৪ ছেলে এবং ৩ কন্যা সন্তান। প্রথম ছেলে তাসনিম দুবাই প্রবাসী। দ্বিতীয় ছেলে হাফিজ মাওলানা আসজাদ আহমদ, ঢাকার একটি মাদরাসার শিক্ষক। তৃতীয় ছেলের নাম তানভীর ও চতুর্থ তানিম। দীর্ঘ ৬০ বছরের জিন্দেগীতে তাঁর রেখে যাওয়া ইলম, আমল ও খেদমতের উত্তরাধিকার যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ তাআলা মরহুমকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন, তাঁর সকল দ্বীনি খেদমত কবুল করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, ছাত্র ও ভক্তবৃন্দকে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দান করুন। আমিন ইয়া রব্বাল আলামিন।

লামনীগ্রাম মাদরাসা প্রাসঙ্গিকতা::
মরহুমের চিন্তা-চেতনা, দুবানিশি স্বপ্নজুড়ে ছিল জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম লামনীগ্রাম মাদরাসা এর উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও দ্বীনি খেদমতের প্রসার। তিনি সবসময় এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ইলমে দ্বীনের বিস্তারে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে মাদরাসাটি ধীরে ধীরে একটি সুপরিচিত দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। ২০২৪ সালে পুরুষ দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) শ্রেণিতে উন্নিত করে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান মাদরাসাকে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টা, পরিকল্পনা ও ত্যাগের ফলেই মাদরাসায় মহিলা বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হয়ে আজ থেকে ১৫ বছর আগে মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত উন্নীত হয়। এর মাধ্যমে অসংখ্য নারী শিক্ষার্থী কুরআন-হাদিস ও ইসলামী জ্ঞানের উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করেন। নারী সমাজে দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার এবং যোগ্য আলেমা তৈরিতে তাঁর এই উদ্যোগ একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। তাঁর এ অবদান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দ্বীনি শিক্ষার এক সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করেছে।

সামাজিক ও অন্যান্য গুণাবলি:
মাওলানা আব্দুল জব্বার রহ., ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুরব্বি। তাঁর কথাবার্তায় ছিল শালীনতা, প্রজ্ঞা ও হৃদয়স্পর্শী ভাষাশৈলীর অপূর্ব সমন্বয়, যা মানুষকে সহজেই মুগ্ধ করত। তিনি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন। ফলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে তাঁর বিচক্ষণতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব ছিল সর্বজনস্বীকৃত। এলাকার জনপ্রতিনিধি, চেয়ারম্যান, মেম্বার এমনকি সংসদ সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক বিষয়ে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতেন। তাঁর সুচিন্তিত মতামত ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর জীবন ছিল মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একজন আলেম, সমাজসেবক ও অভিভাবক হিসেবে তিনি মানুষের হৃদয়ে যে সম্মান ও ভালোবাসার স্থান অর্জন করেছেন, তা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন