- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থেমে যেতে দেবে না সরকার: আরিফুল হক চৌধুরী

অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা যেন কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেবে সরকার। এমনকি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন থেমে না যায়, তা নিশ্চিত করতেও সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

তিনি বলেন, মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া উচিত নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছেলে-মেয়েরাও যাতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, সে বিষয়ে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে সিলেট প্রেসক্লাব ও নূর ফাউন্ডেশন আয়োজিত শিক্ষা সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সিলেট প্রেসক্লাবের আমীনুর রশীদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মোট ১৮ জন শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষা সহায়তার অর্থ তুলে দেওয়া হয়।

সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ও নূর ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা মুকতাবিস উন নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম এবং জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকার সহ-সভাপতি তোফায়েল খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের মেধা বিকাশের পথ সুগম করা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। আর্থিক সংকটের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যাতে ঝরে না পড়ে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ উদ্যোগ শুধু সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও এর আওতায় আসার সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, একটি শিক্ষিত প্রজন্মই পারে পরিবার, সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিতে। তাই দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

মন্ত্রী জানান, এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার সিলেট অঞ্চলে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ এবং তাঁদের পরিবারের প্রয়োজন পূরণে দেশব্যাপী সহায়তা কার্যক্রম চলছে। রিকশাচালকসহ নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষও এসব সহায়তার আওতায় রয়েছেন।

সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীদের সমস্যা ও সম্ভাবনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের নিয়ে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের মৌলিক সমস্যা, সম্ভাবনা ও জনদুর্ভোগের চিত্র সাংবাদিকেরা তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরলে সরকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিষয়গুলো সমাধানে কাজ করার আশ্বাস দেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ও নূর ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা মুকতাবিস উন নূর বলেন, শিক্ষার প্রসার এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয় থেকেই নূর ফাউন্ডেশনের শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রমের সূচনা হয়েছে। শিক্ষার প্রতি পারিবারিক আগ্রহ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নেওয়া এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।
তিনি বলেন, শিক্ষক পরিবারের সন্তান হিসেবে শিক্ষার গুরুত্ব তিনি পারিবারিকভাবেই উপলব্ধি করেছেন। তাঁর প্রবাসী ভাইয়ের সহযোগিতায় শুরু হওয়া এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকেও এ মানবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
মুকতাবিস উন নূর জানান, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে নূর ফাউন্ডেশনের তহবিল এক কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ অর্থ ওয়াক্ফভিত্তিক স্থায়ী আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করে তা থেকে অর্জিত আয় প্রতিবছর শিক্ষা সহায়তা ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সিলেট প্রেসক্লাবের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৭ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৫০ হাজার টাকার অনুদানের মধ্য দিয়ে প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ভবনটির সম্প্রসারণ ঘটে। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সিলেট প্রেসক্লাবকে সাততলা ভবনে রূপ দেওয়ার স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম বলেন, নূর ফাউন্ডেশনের শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য ও তাঁদের সন্তানদের জন্য একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ। এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম শুধু শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তাই দেয় না, বরং সমাজে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতেও ভূমিকা রাখে।তিনি বলেন, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসা সহায়তা এবং শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা ও শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি অবহিত করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীরা সহজে সহায়তা পেতে পারেন। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে এসব উদ্যোগের প্রচার ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
শামসুল ইসলাম আরও বলেন, অর্থের অভাবে কোনো শিশুর স্বপ্ন নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার প্রসার, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজ গঠনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। সিলেট প্রেসক্লাবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে সাংবাদিকদের কল্যাণে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকার সহ-সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, সাংবাদিকেরা সমাজের বিবেক ও দর্পণ। তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত মানুষের দুর্দশা, বঞ্চনা ও নানা অসংগতি জনসমক্ষে উঠে আসে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সমাধানের পথ তৈরিতেও সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্মরণীয় ও কল্যাণকর উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে সিলেট প্রেসক্লাবের নেতারা সাংবাদিকদের চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর কল্যাণ তহবিল গঠনের দাবি জানান। তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিন পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর অসুস্থতা কিংবা বার্ধক্যের কারণে অনেক সাংবাদিক আর্থিক সংকটে পড়েন। এ সময় তাঁদের চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। সাংবাদিকদের কল্যাণে একটি স্থায়ী তহবিল গড়ে তোলা গেলে তাঁদের দুর্দিনে সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বক্তারা সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ট্রেনের আসন ও টিকিট সংকট, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনে জটিলতা এবং প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা সহজ করার বিষয়েও মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিলেট প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি ও সিলেটবাণীর নির্বাহী সম্পাদক এম এ হান্নান, সাবেক সহসভাপতি জিয়াউস শামস শাহীন, সহসভাপতি ফয়সল আলম, দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যুরোপ্রধান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, দৈনিক নয়াদিগন্তের ব্যুরোপ্রধান আব্দুল কাদের তাপাদার, ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন, প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ ফয়ছল আমিন এবং সহসাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ক্লাব সদস্য এম এ মতিন। পরে প্রধান অতিথিসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করা হয়। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে ১৮ জন শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষা সহায়তার অর্থ তুলে দেওয়া হয়।

আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া রোধ, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা জাগিয়েছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন