কুমিল্লার লাকশাম উপজেলার বড় শরিফপুর গ্রামে ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে যায় এক অন্যরকম প্রশান্তিতে। গ্রামের সরু পথ, চারপাশে সবুজের সমারোহ, আর তার মাঝখানে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন মসজিদ। নাটেশ্বর দিঘির পূর্ব পাশে স্থাপিত এই মসজিদটি স্থানীয় মানুষের কাছে যেমন ধর্মীয় উপাসনালয়, তেমনি ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। বড় শরিফপুরের এই মসজিদটি ‘কোতওয়ালী মসজিদ’ নামেও পরিচিত। কারণ এর নির্মাতা মুহাম্মদ আয়াত ছিলেন একজন কোতওয়াল বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই মসজিদ আজও অতীতের গৌরবময় ইতিহাস বহন করে চলেছে। মুঘল স্থাপত্যরীতির নিপুণ কারুকাজ, গম্বুজের সৌন্দর্য, শিলালিপির ভাষা এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং বাংলার মুসলিম স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।
বাংলার মাটিতে মুঘল শাসনের সময় অসংখ্য মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। সেসব স্থাপনার অনেকগুলো সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেলেও কিছু কিছু এখনো নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। বড় শরিফপুরের কোতওয়ালী মসজিদ তেমনই একটি অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ।
মসজিদের শিলালিপি থেকে জানা যায়, এর নির্মাণকাল হিজরি ১০৬৮, অর্থাৎ ১৬৫৭-৫৮ খ্রিষ্টাব্দ। তবে আরেকটি শিলালিপিতে ১৭০৬-০৭ খ্রিষ্টাব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, পরবর্তী সময়ে মসজিদটির সংস্কার কিংবা সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। ফার্সি ভাষায় নাসতালিক রীতিতে উৎকীর্ণ এই শিলালিপিগুলো কেবল নির্মাণকালই নয়, বরং সে সময়ের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক রুচিরও পরিচয় বহন করে।
সাংকেতিক ভাষায় বা ক্রোনোগ্রাম পদ্ধতিতে নির্মাণসাল উল্লেখ করা ছিল তখনকার মুসলিম স্থাপত্যে এক বিশেষ শিল্পরীতি। এতে ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি সাহিত্যিক সৌন্দর্যও যুক্ত হতো। বড় শরিফপুরের মসজিদের শিলালিপি সেই ঐতিহ্যেরই এক চমৎকার নিদর্শন।
মসজিদটির অবস্থানও অত্যন্ত মনোরম। বিশাল নাটেশ্বর দিঘির পূর্ব পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি দূর থেকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দিঘির শান্ত জলের প্রতিবিম্বে মসজিদের গম্বুজ যেন আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। চারপাশে প্রাচীরঘেরা পরিবেশ মসজিদটিকে দিয়েছে আলাদা ধর্মীয় আবহ।
গ্রামের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে অবস্থান করায় এখানে এক ধরনের নীরব প্রশান্তি অনুভূত হয়। ভোরের আজান কিংবা বিকেলের মৃদু আলোয় এই মসজিদ যেন অতীতের এক মায়াময় জগতে নিয়ে যায় দর্শনার্থীদের।
বড় শরিফপুরের মসজিদটি আয়তকার পরিকল্পনায় নির্মিত এবং এটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট। স্থাপত্যরীতিতে মুঘল প্রভাব এতটাই স্পষ্ট যে অনেক গবেষক একে ঢাকার লালবাগ দুর্গের মসজিদের অনুকরণে নির্মিত বলে মনে করেন।
মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ। খিলানযুক্ত এই প্রবেশপথগুলো আলকোভ দ্বারা আবৃত। মাঝের প্রবেশপথটি আকারে বড় হওয়ায় সেটি মূল প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রবেশপথের নকশায় সমান্তরাল লিন্টেল ব্যবহার করা হয়েছে, যার ওপর কৃত্রিম খিলান সৃষ্টি করা হয়েছে।
প্রতিটি প্রবেশপথ আয়তকার ফ্রেমে আবদ্ধ এবং দু’পাশে রয়েছে আয়তকার কুলুঙ্গি প্যানেল। এসব অলংকরণ স্থাপনাটিকে দিয়েছে এক অনন্য নান্দনিকতা। মুঘল স্থাপত্যে সৌন্দর্য ও ভারসাম্যের যে নিখুঁত সমন্বয় দেখা যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই মসজিদ।
মসজিদের চার কোণায় রয়েছে অষ্টকোণাকৃতির বুরুজ। বুরুজগুলো ছাদের উপর পর্যন্ত উঠে গেছে এবং শীর্ষে কুপোলা সংযোজন করা হয়েছে। কলসচূড়াসম্বলিত এই কুপোলাগুলো মসজিদের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মুঘল স্থাপত্যে বুরুজ ব্যবহারের একটি বিশেষ তাৎপর্য ছিল। এগুলো কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং স্থাপনাটিকে আরও দৃঢ় ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলত। বড় শরিফপুরের মসজিদের বুরুজগুলো সেই ঐতিহ্যেরই ধারক।
এ ছাড়া মসজিদের কার্নিশ সমান্তরাল, যা মুঘলরীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। বাংলার অনেক প্রাচীন মসজিদে বাঁকানো কার্নিশ দেখা গেলেও এখানে সমান্তরাল কার্নিশ ব্যবহার করা হয়েছে। ছাদের চারপাশে নকশা করা প্যারাপেট স্থাপনাটিকে দিয়েছে আরও শৈল্পিক রূপ।
মসজিদটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর তিনটি গম্বুজ। মধ্যবর্তী গম্বুজটি আকারে কিছুটা বড়, যা পুরো স্থাপনাটির কেন্দ্রীয় গুরুত্বকে নির্দেশ করে। গম্বুজগুলো অষ্টকোণাকার ড্রামের উপর স্থাপিত।
প্রতিটি গম্বুজের উপরে কলসচূড়া রয়েছে, যা পদ্মপাতার ভিত থেকে উপরের দিকে উঠে গেছে। এই অলংকরণে ইসলামী ও স্থানীয় শিল্পরীতির এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
গম্বুজের চারপাশে প্যারাপেটের নকশা মসজিদটিকে দিয়েছে বাড়তি সৌন্দর্য। সূর্যের আলো যখন গম্বুজের ওপর পড়ে, তখন এর ছায়া ও কারুকাজ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
মসজিদের অভ্যন্তর এক আইলবিশিষ্ট। পেনডেনটিভ পদ্ধতির মাধ্যমে তিনটি গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে। এটি মুঘল স্থাপত্যে বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল, যার মাধ্যমে চতুষ্কোণ ভিত্তির উপর গোলাকার গম্বুজ স্থাপন করা সম্ভব হয়।
কিবলা প্রাচীরে রয়েছে তিনটি মিহরাব। খিলানসম্বলিত অবতলাকৃতির এই মিহরাবগুলো আয়তকার ফ্রেমে আবদ্ধ। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অপেক্ষাকৃত বড় ও অলংকৃত।
মিহরাবের কারুকাজে এক ধরনের শৈল্পিক সংযম দেখা যায়। অতিরিক্ত অলংকরণের পরিবর্তে এখানে ভারসাম্যপূর্ণ নকশা ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরো অভ্যন্তরকে দিয়েছে শান্ত ও পবিত্র আবহ।
এই মসজিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর দুটি শিলালিপি। একটি কেন্দ্রীয় মিহরাবের উপরে এবং অন্যটি পূর্বদিকের প্রবেশপথের উপরে স্থাপন করা হয়েছে।
ফার্সি ভাষায় উৎকীর্ণ এই শিলালিপিগুলো নাসতালিক রীতিতে লেখা। নাসতালিককে ফার্সি ক্যালিগ্রাফির সবচেয়ে নান্দনিক ধারা হিসেবে ধরা হয়। এর বক্ররেখা ও অলংকরণ পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য।
শিলালিপিতে সাংকেতিক ভাষায় নির্মাণকাল উল্লেখ করা হয়েছে, যা সে সময়কার মুসলিম জ্ঞানচর্চা ও শিল্পবোধের পরিচায়ক।
বড় শরিফপুরের এই মসজিদ শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়; এটি স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অংশ। প্রতিদিন গ্রামের মানুষ এখানে নামাজ আদায় করেন। জুমার দিন কিংবা রমজানে মসজিদটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
প্রবীণরা এখনো নানা স্মৃতিচারণ করেন এই মসজিদকে ঘিরে। কেউ বলেন, একসময় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে এসে ইবাদত করতেন। আবার কেউ মনে করেন, এই মসজিদ ছিল এলাকার শিক্ষা ও ধর্মীয় আলোচনার কেন্দ্র।
বাংলাদেশে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা অবহেলা ও অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে। বড় শরিফপুরের কোতওয়ালী মসজিদ এখনো দাঁড়িয়ে থাকলেও এর যথাযথ সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। প্রাকৃতিক ক্ষয়, জলবায়ুর প্রভাব এবং অপরিকল্পিত সংস্কার অনেক সময় প্রাচীন স্থাপনার মূল সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। তাই প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এর রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
একইসঙ্গে পর্যটন ও গবেষণার ক্ষেত্রেও এই মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিহাস ও স্থাপত্য বিষয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এটি হতে পারে এক মূল্যবান অধ্যয়নক্ষেত্র।
বড় শরিফপুরের কোতওয়ালী মসজিদ কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এটি ইতিহাস, শিল্প, ধর্মীয় অনুভূতি ও সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রকাশ। প্রায় চারশ’ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদ আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর গম্বুজ, বুরুজ, মিহরাব কিংবা শিলালিপি—সবকিছু যেন অতীতের এক গৌরবময় অধ্যায়ের কথা বলে।
