বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এর কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সংগ্রহশালা।
সংস্কারের পর ১৩ সেপ্টেম্বর সংগ্রহশালাটি পুনরায় চালু করা হয়। সেখানে ১৯৪৮ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জিন্নাহর বক্তব্য, ১৯৪০ সালের লাহোর সম্মেলন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত ডন পত্রিকার প্রতিবেদনসহ তাঁর তিনটি ছবি প্রদর্শন করা হয়। ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়, ১৯০৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরতেই ছবিগুলো রাখা হয়েছে। তবে পরদিন এক শিক্ষার্থী জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান।
ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিক্ষক নেটওয়ার্ক নিরপেক্ষ তদন্ত ও ঐতিহাসিক স্মারক পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলসহ কয়েকটি ছাত্রসংগঠন জিন্নাহর ছবি অপসারণের দাবি জানিয়ে বলেছে, এ প্রদর্শন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবে হিংস্র কায়দায় মোহাম্মদ আলী জিন্নার-এর ছবি অপসারণকে নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে ভিন্ন ভিন্ন মতামত উঠে আসছে। কেউ জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকা ও চিন্তাচেতনার সমালোচনা করছেন, আবার কেউ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে যথাযথ প্রেক্ষাপটে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।
ইতিহাসের মহান ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও মূল্যায়ন সব সময়ই থাকবে। তাঁদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, মতাদর্শ এবং কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে গবেষণা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সমালোচনা ও অবমাননার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি ছিঁড়ে ফেলা, ভাঙচুর করা কিংবা হিংস্র আচরণের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের কাম্য হতে পারে না। ইতিহাসের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলে তার জবাব হওয়া উচিত যুক্তি, তথ্য ও গবেষণার মাধ্যমে।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ভাষানীতি নিয়ে সমালোচনারও ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য দেন। এই অবস্থান পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক পটভূমি গঠনে ভূমিকা রাখে।
এখানে ইতিহাসকে সরলীকরণ না করে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—এই তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনার সময় জিন্নাহ জীবিত ছিলেন না। তিনি ১৯৪৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে এসব আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী ঘটনাগুলোকে বুঝতে হবে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয় এবং পরবর্তী সময়ে এই ভূখণ্ডে ভাষা, স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন বিকশিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—এই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় চেতনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা শক্তিশালী হয়। তাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই; আবার একটিকে অন্যটির সঙ্গে একাকার করাও সঠিক নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কোনো ব্যক্তির একক কৃতিত্বের কাহিনি নয়। একটি রাষ্ট্রের জন্ম, তার রাজনৈতিক বিকাশ এবং পরবর্তী পরিবর্তনের পেছনে বহু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা থাকে। জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন—এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। আবার পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈষম্য ও বাঙালির অধিকারবঞ্চনার বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল, সেটিও বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঢাকসু জাদুঘরে স্থাপিত পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঐতিহাসিক ছবির নিচে স্পষ্ট ক্যাপশন ছিল—‘১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাঁর বক্তব্য’। ফলে সেখানে ইতিহাস আড়াল করার কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। বরং ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল।
এ অবস্থায় ছবিটি অপসারণের ঘটনায় ইতিহাসের মূল্যায়নের চেয়ে রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা প্রাধান্য পেয়েছে—এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্য বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতবিরোধ প্রকাশের জন্য ইতিহাসের নিদর্শনকে হিংস্র কায়দায় অপসারণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইতিহাসের সঙ্গে দ্বিমত হলে তার জবাব দিতে হবে যুক্তি, তথ্য ও গবেষণার মাধ্যমে; ভাঙচুর বা অবমাননার মাধ্যমে নয়।
এ ধরনের ঘটনায় শুধু একটি ছবি অপসারণের প্রশ্ন থাকে না; বরং ইতিহাস সংরক্ষণ, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ এবং মতপ্রকাশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রভাব আরও ব্যাপক। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষাদানের প্রতিষ্ঠান নয়, এটি মুক্তবুদ্ধি, গবেষণা ও ঐতিহাসিক অনুসন্ধানেরও কেন্দ্র।
ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ইতিহাস ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক সচেতনতা সম্পর্কে বহির্বিশ্বের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য দায়িত্বশীল আচরণ ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি।
ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে পছন্দ না হলেই তা মুছে ফেলার চেষ্টা করা যায় না। বরং ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে যথাযথ তথ্য ও প্রেক্ষাপটসহ উপস্থাপন করাই একটি সচেতন জাতির দায়িত্ব। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একইভাবে ১৯৪৮ সালের ভাষানীতি, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছুকেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বুঝতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এ ঘটনার বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত করবে এবং ভবিষ্যতে কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন অপসারণ বা অবমাননার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা অনুসরণ করবে। ইতিহাসকে রাজনৈতিক বিরোধের হাতিয়ার না বানিয়ে গবেষণা, যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে মূল্যায়ন করাই হতে পারে আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয়।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা, ভাষানীতি এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা ও সমালোচনার পথ উন্মুক্ত থাকা উচিত। কিন্তু ইতিহাসের কোনো চরিত্রকে অবমাননা করে বা হিংস্রতার মাধ্যমে সেই ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা, বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছুকে যথাযথ প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা হবে। ইতিহাসকে সম্মান করা মানে শুধু অতীতের ব্যক্তিত্বদের সম্মান করা নয়; বরং সত্য, যুক্তি ও তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব না দিলে আজকের বাংলাদেশ কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জন্ম নিত? তা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়। পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বাংলাদেশের জন্মের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তবে ইতিহাসের মূল্যায়নে সম্ভাব্য বিকল্প ভবিষ্যৎ এবং নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনাকে পৃথক করে দেখা প্রয়োজন। অখণ্ড ভারত অব্যাহত থাকলে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান কী হতো, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু ১৯৪৭ সালের বিভাজন যে পূর্ববাংলার মানুষের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছিল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
পূর্ববাংলার ইতিহাসে কৃষক ও প্রজাদের ভূমি-অধিকারের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রবর্তিত জমিদারি ব্যবস্থায় ভূমির ওপর জমিদারদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে কৃষক ও প্রজাদের বড় একটি অংশ ভূমি ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হন। পূর্ববাংলার কৃষকসমাজের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এই ব্যবস্থার অবসান এবং ভূমির ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা।
১৯৪৭ সালের পর পূর্ববাংলায় জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে জমিদারি ব্যবস্থার অবসান এবং কৃষক-প্রজাদের ভূমি-অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বড় পরিবর্তন আসে।
এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা যায়। তবে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পেছনে কৃষক আন্দোলন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আইন প্রণয়নের সম্মিলিত ভূমিকা ছিল। তাই এর সব কৃতিত্ব এককভাবে একজন নেতার ওপর আরোপ না করে সামগ্রিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে মূল্যায়ন করা অধিক যুক্তিসঙ্গত।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৩ মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জীবিত ছিলেন না। এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ দায় তাঁর ওপর আরোপ করা ইতিহাসের সময়কাল ও ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো, রাষ্ট্রচিন্তা এবং পরবর্তী শাসকদের কর্মকাণ্ড ইতিহাসের পৃথক বিষয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝাও প্রয়োজন।
জিন্নাহকে নিয়ে সমকালীন বিতর্কে তাই আবেগের পরিবর্তে তথ্য, যুক্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। একজন নেতার অবদান মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর জীবদ্দশার কর্মকাণ্ড, পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলি এবং ইতিহাসে তাঁর উত্তরাধিকার—এই বিষয়গুলোকে পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
জিন্নাহর মৃত্যুর পরও পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাঁর নাম ও আদর্শের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। ১৯৬৫ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান ফাতিমা জিন্নাহর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিন্নাহর পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্ব একসময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল।
জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৩ মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর শাসনামল ছিল সংক্ষিপ্ত। তাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে সেই সময়ের কর্মকাণ্ড ও পরবর্তী শাসনব্যবস্থার কর্মকাণ্ডকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সূত্র: বাংলাপিডিয়া: ভাষা আন্দোলন
লেখক: কবি ও সাংবাদিক