নেত্রকোনার মদন উপজেলায় শিক্ষকের ধর্ষণে ১২ বছরের এক শিশু ছাত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর স্থানীয় হযরত ফাতেমাতুজ জোহুরা মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক। গত বছরের নভেম্বরে ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন ও অসুস্থতা দেখা দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মারাত্মক রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক গঠনগত অপূর্ণতার কারণে শিশুটির জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে। এ ঘটনায় গত ৩০ এপ্রিল ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। অভিযুক্ত শিক্ষক বর্তমানে সপরিবারে পলাতক রয়েছেন এবং পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের চিন্তাশীল গবেষক আলেমরা এই বিষয়ে নানা মতামত দিয়েছেন। ফেসবুকে দেওয়া তাদের অভিমত তোলে ধরা হলো।
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাওলানা সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীর লিখেছেন, মহিলা মাদরাসার প্রিন্সিপাল কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়ে ১২ বছরের এক মাদরাসা ছাত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমি ময়মনসিংহের একজন বিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। তিনি নিজেও ময়মনসিংহ সিটিতে বৃহৎ মহিলা মাদরাসা পরিচালনা করেন এবং ময়মনসিংহ জেলার আলেমদের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন ‘ইত্তেফাকুল উলামা ময়মনসিংহ’-এর অন্যতম নেতা।
আমি তাকে অনুরোধ করলাম ঘটনার সত্যতা কী সেটা জানতে এবং যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, সে ব্যাপারে জানাতে! তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আসলে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, তেমন কোনো অথরিটি আমাদের কওমি মহলে নেই।
তিনি আফসোসের সঙ্গেই জানালেন, সদ্য দাওরা পাশ করে একজন আলেম একটা ফ্ল্যাট বা গুদাম ভাড়া নিয়ে মাদরাসা শুরু করে দিয়েছে। কারো কোনো অনুমোদন বা নিবন্ধনের প্রয়োজন পড়ে না। কোনো ধরনের ক্রাইটেরিয়া মেইনটেইনের বাধ্যবাধকতা নেই। ইচ্ছা হলো আর অমনি ৭ হাজার টাকা দিয়ে একটা দুই-তিন রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মাদরাসা শুরু করে দিলেন।
তিনি বললেন, আমরা কিছুদিন আগে এমন কিছু মাদরাসায় গিয়ে তাদেরকে মাদরাসার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। মাদরাসার প্রিন্সিপাল ক্ষেপে গিয়ে বললেন, আমার বাপের টাকা দিয়ে আমি মাদরাসা করেছি, আপনার কাছে জবাবদিহি করব কেন?
এই হলো যেখানে সেখানে মহিলা মাদরাসা গজিয়ে ওঠার একটা কমন প্রবণতা এবং একশ্রেণির জারজ সেই প্রবণতার ফাঁক গলে কোমলমতি শিশু-কিশোরীদের ওপর নিজেদের কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করছে।
সেদিন এক সাংবাদিক বন্ধু বেশ কনফিডেন্সের সঙ্গে একটা দাবি উত্থাপন করলেন, ৩ বছর বয়সী এমন কোনো মাদরাসা দেখান যেখানে এ ধরনের ধর্ষণ বা বলাৎকারজনিত কোনো ঘটনা ঘটেনি। হয়তো জনসম্মুখে প্রকাশ হয়নি, কিন্তু অভ্যন্তরে এমন ঘটনা ঘটেছে এটা নিশ্চিত।
এই হারামখোরদের রুখতে হবে। কীভাবে রুখতে হবে বা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, সে ব্যাপারে আপনারা জানাবেন। এ বিষয়ে আমার চেয়ে আপনারা অনেক বেশি বিজ্ঞ ও ওয়াকিবহাল।
তবে একটি বিষয় মনে রাখবেন। মাদরাসার এসব অনৈতিক-অনাচারের বিরুদ্ধে আপনি-আমি যত বেশি চুপ থাকব, হারামখোরেরা তত বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে। ঘটনা জেনেও আপনার নিশ্চুপ থাকা মানে আপনি আরেকজন ফাতেমা বা ফারজানার ধর্ষণের পথকে সুগম করে দিলেন। তাই আপনার চুপ থাকা কখনোই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সুসংহত করে না, বরং আপনার নিশ্চুপ থাকার বিষয়টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কলুষিত করা সহজ করে দেয়।
উৎপাদনে রেকর্ড গড়ল রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রউৎপাদনে রেকর্ড গড়ল রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র
মাদ্রাসাশিক্ষক, লেখক, গবেষক মুফতি আমির ইবনে আহমদ লিখেছেন, সাম্প্রতিককালে কোনো কোনো মহিলা মাদরাসার অপ্রীতিকর ও ন্যাক্কারজনক কিছু ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা লজ্জাজনক ও অমার্জনীয় অপরাধ।
এইসব অপরাধের সঠিক তদন্ত না হওয়া ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না হওয়ায় অপরাধীরা আস্কারা পাচ্ছে। একটি উপকারী শিক্ষা আয়োজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, কলঙ্কিত করছে।
দায়িত্বশীল উলামায়ে কেরাম ও কওমি অঙ্গনের গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দ্বীনি এই শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি হবে, অভিভাবকগণ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বেন। এতে করে সমাজের একটি বড় অংশ দ্বীনিশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্রোতে গা ভাসিয়ে কেউ কেউ এই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করার আওয়াজ তুলছেন। আমরা বলতে চাই, মাথা থাকলে ব্যাথাও থাকবে, কোনো বুদ্ধিমান মানুষই ব্যাথা উপশমের জন্য মাথা কাটার সিদ্ধান্ত নেবেন না নিশ্চয়ই।
তবে মহিলা মাদরাসাগুলো নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার মান, পর্দা ব্যবস্থা, পাঠদান পদ্ধতি, পরিচালনা ও অভ্যন্তরিণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোপরি অভিজ্ঞ আলেমদের সরাসরি তত্ত্বাবধানকে বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
এগুলো আলেমদেরকেই করতে হবে দ্বীনের স্বার্থে, দীনি প্রতিষ্ঠান রক্ষার স্বার্থে। কওমি অঙ্গনের জন্য সরকারি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ সুখকর হবে না। কিন্তু আমরা ব্যর্থ হলে অবধারিতভাবেই তা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসবে।
গণমাধ্যমের জন্য সরকারের পরিকল্পনার কথা জানালেন তথ্যমন্ত্রীগণমাধ্যমের জন্য সরকারের পরিকল্পনার কথা জানালেন তথ্যমন্ত্রী
বিশুমিয়ারহাট নূরিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা হেফজখানা ও এতিমখানা, মিরসরাইয়ের প্রিন্সিপাল ও লেখক-গবেষক মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী লিখেছেন, আবাসিক মহিলা মাদরাসার প্রয়োজনীয়তাও নেই যুক্তিকতাও নেই। সুতরাং সকাল ৭ টায় ক্লাস শুরু করে দুপুর ১ টায় ছুটি, এমনই হওয়া চাই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক হলেন নজরুল ইসলামবাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক হলেন নজরুল ইসলাম
বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক, লেখক-গবেষক মাওলানা মুহিউদ্দিন ফারুকী লিখেছেন, সচেতন, বিজ্ঞ ও মুরুব্বী আলেমদের উদ্যোগে জেলাভিত্তিক মহিলা মাদরাসা পর্যবেক্ষক টিম গঠন করা জরুরি। এলাকাভিত্তিক কোনো বড় ব্যক্তিও যদি কোনো অসুন্দর কাজ করে থাকে, তাহলে তাকেও বিচারের আওতায় আনা উচিত। পর্যবেক্ষণ, জবাবদিহিতা না থাকলে মহিলা মাদরাসাগুলোর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে চলে যাবে।
মহিলা মাদরাসার সমস্যা সমাধানে করণীয়
মহিলা মাদরাসার বিষয়ে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা সামনে আসছে। সবগুলো সত্য নয়, আবার সবগুলো মিথ্যাও নয়। রয়েছে অপপ্রচার ও মিথ্যা এবং ফাঁসানোর ঘটনা, আবার রয়েছে সত্য ঘটনা। এমন অপ্রীতিকর ঘটনা আজকেই নতুন না, আরও কয়েক বছর আগে থেকেই এসব শুনছি। ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সূত্রের ঘটনাগুলো অবশ্যই সত্য। গুটিকতেক ব্যক্তির জন্য সবার বদনাম হচ্ছে।
প্রশ্ন হতে পারে, টুপি দাড়িওয়ালা লোকরা কেমনে এসব কাজ করে? দেখুন, আল্লাহ তাআলা এবং নবীজি (সা.) কেবল উপদেশ দেননি, কেবল তাকওয়ার ওয়াজই করেননি, বরং শাস্তির ব্যবস্থাও রেখেছেন। যেমন চুরি করলে হাত কাটা যাবে, যিনা করলে মৃত্যুদণ্ড। আখেরাতের ভয়ের পাশাপাশি দরকার দুনিয়ার শাস্তি এবং ভয়। যেসব মহিলা মাদরাসার কমিটি নেই, তদারকি ও তদন্ত নেই, পরিচালক ও শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নেই, যেখানে পরিচালক প্রভাবশালী, সেসব মাদরাসায় এসব অপ্রীতিকর ঘটনা বেশি ঘটে।
ছাত্রীদের সাথে যেমন ঘটে, তদ্রূপ শিক্ষিকাদের সাথেও ঘটে, এমনকি এটাই নাকি বেশি। মিউচুয়াল ঘটনাগুলো সামনে আসে না এবং জোরপূর্বক হলেও অনেক মানসম্মানের ভয়ে সামনে আনে না। কোনো ঘটনা অস্বাভাবিক হলে কিংবা মনোমালিন্য হলেই সামনে আসে।
স্কুল-কলেজ-ভাসির্টি, আলিয়া মাদরাসা সবখানেই অপ্রীতিকর এসব ঘটনা ঘটে। তাই বলে তো শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ করা যাবে না। অপরাধ বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। কর্তৃপক্ষ, রাষ্ট্র, সমাজ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা ও পরামর্শ করা উচিত। শিক্ষাবিদ, আলেমসমাজ, অভিভাবক, প্রশাসন, সকলে মিলে আলোচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু করণীয় এমন হতে পারে-
১. কেউ ইচ্ছা করলেই মহিলা মাদরাসা করতে পারবে না। কেউ আগ্রহী হলে শিক্ষাবোর্ডে আবেদন করবে, তারা তদন্ত করে নির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে অনুমোদন দেবেন। অনুমোদন ছাড়া কেউ মহিলা মাদরাসা করতে পারবে না। এলাকাবাসী যে কোনো সময় গিয়ে দেখতে চাইবে, আপনার অনুমোদন আছে?
২. ভাড়া প্রতিষ্ঠান হলেও কমিটি থাকতে হবে। আলেমসমাজ, শিক্ষিত সমাজ, দ্বীনদার এলাকাবাসী মিলে কমিটি হবে।
৩. শিক্ষাবোর্ডে মহিলা মাদরাসা অণুবিভাগ নামে স্ততন্ত্র বিভাগ থাকবে। তাদের কাছে অভিযোগ জমা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ/ ইমু নম্বর থাকবে, যেন যে কেউ যে কোনো সময় অভিযোগ জানাতে পারে।
৪. শিক্ষাবোর্ড থেকে তদারকি করা হবে, তারা নির্দিষ্ট নীতিমালা পালন করছে কি না?
৫. আবাসিক মহিলা মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। তবে ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান হলে, যেখানে প্রশস্ত জায়গা রয়েছে, তদারকি রয়েছে, সেখানে আবাসিকের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। কোনো ভাড়া প্রতিষ্ঠানে আবাসিক মহিলা মাদরাসার অনুমোদন দেওয়া যাবে না।
৬. প্রত্যেক শিক্ষক ও শিক্ষিকার নিবন্ধন নম্বর থাকবে। শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে তাদের সকল তথ্য থাকবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি আর শিক্ষকতা করতে পারবেন না। বাংলাদেশের কোথাও না।
৭. মহিলার মাদরাসার কোনো পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে আর জীবনে মাদরাসা পরিচালনা করতে পারবে না। অন্য কাজ করবে। এমন কঠোর নিয়ম করতে হবে।
৮. ধর্ষণ, ব্যভিচার, বলাৎকার ইত্যাদি ফৌজদারি অপরাধ হলে তাকে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হবে।
৯. মহিলা মাদরাসার সিলেবাস নিয়ে আরও পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন করা উচিত। গার্হস্থ্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, হস্তশিল্প ইত্যাদি প্রয়োজনীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
১০. অভিভাবকদের উচিত আরও সচেতন হওয়া, আবাসিকে ছাত্রীদের না দেওয়া, মেয়ের মতিগতির প্রতি লক্ষ্য রাখা। মহিলা মাদরাসার কর্তৃপক্ষ যদি সুন্দর, সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাষ্ট্র একসময় এমন ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে, যা আপনাদের পছন্দ হবে না। সুতরাং এখনই সতর্ক হোন।
