- Dainiksylhet.com - https://dainiksylhet.com -

মুখে কথা নেই, বাবার মৃত্যুর পর কাঁধে পরিবারের ভার—শ্রমেই সামাদের জীবন

প্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি বিয়ানীবাজারের আব্দুস সামাদকে; কারও কাছে হাত না পেতে এক দশক ধরে বাজারে শ্রম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি

সকাল হলেই বারইগ্রাম বাজারের ব্যস্ততার মধ্যে দেখা মেলে আব্দুস সামাদের। কারও পানি প্রয়োজন, তিনি ছুটে যান। চায়ের অর্ডার পৌঁছে দিতে হবে, সেখানেও সামাদ। মাছের বালতি কিংবা ঝুড়ি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে হবে—বাঁকা হাত নিয়েই কাজে লেগে যান তিনি। মুখে কোনো শব্দ নেই, অথচ সারাদিনের কর্মব্যস্ততায় তার উপস্থিতি টের পান বাজারের প্রায় সবাই।

বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের বারইগ্রাম গ্রামের মৃত আব্দুল গণির বড় ছেলে আব্দুস সামাদ। বয়স প্রায় ৩০ বছর। জন্মগতভাবে বাক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না। একটি হাতও স্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানেননি তিনি।

প্রায় ১২ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর জীবনের বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে ওঠে সামাদের সামনে। চার ভাইয়ের মধ্যে বড় তিনি। একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। নিজের স্ত্রী ও ছোট্ট কন্যাসন্তানের দায়িত্বের পাশাপাশি পরিবারের প্রতিও দায়িত্ববোধ থেকে গেছে তার কাঁধে। সেই দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাননি। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে উপার্জনের পথ বেছে নিয়েছেন।

প্রায় এক দশক ধরে বারইগ্রাম বাজারই সামাদের কর্মস্থল। প্রতিদিন সকালে কাজের সন্ধানে বাজারে আসেন। কখনো মাছ ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেন, কখনো বাজারের দোকানিদের ছোটখাটো কাজ করে দেন। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা—কাজের মধ্যেই কেটে যায় তার দিন। অনেক সময় রাত পর্যন্ত বাজারে থাকেন।

মাছ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করাই তার প্রধান কাজ। কারও পানি লাগলে পানি এনে দেন, চায়ের প্রয়োজন হলে চা পৌঁছে দেন। মাছ রাখার বালতি, ঝুড়ি কিংবা অন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা-নেওয়া করেন। বাজারের কাজ শেষ হলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজেও হাত লাগান। পাশাপাশি পলিথিন বিক্রি করেও আয় করেন।

কথা বলতে না পারায় সামাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথোপকথন করা কঠিন। নিজের প্রয়োজন বা অনুভূতির কথা তিনি ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তার কর্মই যেন তার সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষা। প্রতিদিনের পরিশ্রমে তিনি জানান দেন—তিনি কারও করুণার পাত্র হয়ে নয়, নিজের শ্রমে বাঁচতে চান।

বারইগ্রাম বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সামাদের সম্পর্কও গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের শ্রম আর বিশ্বাসের ওপর। প্রায় ১০ বছর ধরে তাদের নানা কাজে সহযোগিতা করতে করতে তিনি এখন বাজারের পরিচিত মুখ। ব্যবসায়ীদের অনেকেই তাকে পরিবারের একজনের মতোই দেখেন।

মাছ ব্যবসায়ী সেলিম উদ্দিন বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে সামাদ বাজারের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করছেন। কথা বলতে না পারলেও কাজের সময় তার আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। বাজারের সবাই তাকে ভালোবাসেন এবং যার যতটুকু সামর্থ্য, সে অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করেন।

স্থানীয় সংবাদকর্মী জয়নুল ইসলাম বলেন, “আব্দুস সামাদ কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনসংগ্রামকে থামাতে পারেনি—তাঁর এই আত্মনির্ভরতার চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
ফল ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান বলেন, সামাদ কারও কাছে হাত পেতে থাকতে চান না। নিজের মতো করে পরিশ্রম করেন এবং আয় করেন। মানুষের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করায় ব্যবসায়ীরাও তাকে সাধ্যমতো টাকা দেন। তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন বলেও জানান মুজিবুর রহমান।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী আলীম উদ্দিন বলেন, চার ভাইয়ের মধ্যে সামাদ সবার বড়। তাদের একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সামাদের ওপর দায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও সামাদ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করেন।

সামাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার স্ত্রী গৃহকর্মী। তাদের দেড় বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। স্ত্রী-সন্তানের সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজের পরিবারের প্রয়োজনেও সহযোগিতা করেন তিনি। দিনে ঠিক কত টাকা আয় করেন, তার নির্দিষ্ট হিসাব জানা যায়নি। তবে যে আয় করেন, সেটিই তার সংসারের অন্যতম ভরসা।

সামাদ সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতাও পান বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। পরিবারের আরেক সদস্য, তার ছোট ভাইও মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। সীমিত সামর্থ্যের এই পরিবারে তাই সামাদের উপার্জনের গুরুত্ব অনেক।

সামাদের জীবনের গল্পে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তার আত্মমর্যাদা। জন্মগত প্রতিবন্ধকতা তাকে স্বাভাবিক জীবনের অনেক সুযোগ থেকে দূরে রেখেছে। বাবার মৃত্যুর পর জীবনের বোঝাও হয়েছে ভারী। কিন্তু কোনো কিছুই তাকে মানুষের কাছে হাত পাতার পথ বেছে নিতে বাধ্য করতে পারেনি।

তার ছোট্ট মেয়েটিই এখন তার জীবনের অন্যতম বড় ভাবনা। মেয়েটি যখন বড় হবে, তখন যেন বাবার সংগ্রাম তাকে অনুপ্রেরণা দেয়—হয়তো সামাদের নীরব লড়াইয়ের ভেতরে এমন একটি স্বপ্নই লুকিয়ে আছে।

বারইগ্রাম বাজারের ব্যস্ততার মধ্যে প্রতিদিন তাই দেখা যায় একই দৃশ্য—বাঁকা হাত, নীরব মুখ, অথচ থেমে নেই সামাদ। কেউ ডাকলে ছুটে যান, কোনো কাজ পেলে করে দেন। বিনিময়ে যা পান, তা দিয়েই চলে তার সংসার।

সামাদের জীবনের গল্প করুণার নয়, বরং সংগ্রামের। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের কাজ করার ইচ্ছাকে থামিয়ে দিতে পারে না। মুখে কথা না থাকলেও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরি করা যায়।

সামাদ কথা বলতে পারেন না। নিজের কষ্টের গল্পও বলতে পারেন না। কিন্তু প্রতিদিন বারইগ্রাম বাজারে তার ঘাম ঝরা শ্রম যেন একটাই কথা বলে—প্রতিবন্ধকতা আমার শরীরে, আমার স্বপ্নে নয়।প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন করুণা নয়, বরং মর্যাদা, সুযোগ এবং নিজের সক্ষমতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত পরিবেশ। প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে সেই সহায়তার লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তিকে আরও স্বাবলম্বী করে তোলা। সামাদের মতো যারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করছেন, তাঁদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে উপযোগী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

সমাজে তাঁদের শুধু সহায়তা পাওয়ার মানুষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে সক্ষম ও কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ব্যক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ, সহজলভ্য ও সহায়ক কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তাঁরাও পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।

সামাদের গল্প তাই কেবল একজন মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প নয়; এটি সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এমন ব্যক্তিরা কীভাবে নিজেদের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবার ও সমাজে অবদান রাখতে পারেন, তারও একটি বাস্তব উদাহরণ। প্রয়োজন করুণার দৃষ্টি নয়—প্রয়োজন মর্যাদা, উপযুক্ত কাজের সুযোগ এবং সহায়ক পরিবেশ।

কথা বলতে পারেন না সামাদ। কিন্তু প্রতিদিনের শ্রম, দায়িত্ববোধ আর আত্মমর্যাদাই যেন তাঁর হয়ে কথা বলে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন