দুনিয়ার জীবনে মানুষ যত সুখ-সমৃদ্ধিই অর্জন করুক, তা একদিন শেষ হয়ে যাবে। যৌবন বার্ধক্যে রূপ নেবে, সুস্থতা অসুস্থতায় পরিণত হবে, প্রিয়জনেরা একে একে বিদায় নেবে—এমনকি একসময় দুনিয়ার জীবনও শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর নেককার বান্দাদের জন্য এমন এক আবাস প্রস্তুত করে রেখেছেন, যেখানে নেই মৃত্যু, নেই বার্ধক্য, নেই অসুস্থতা, নেই দুঃখ-কষ্ট। সেটিই জান্নাত—মুমিনের চূড়ান্ত সফলতার ঠিকানা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও, যার বিস্তৃতি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমান; যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩)
জান্নাত আল্লাহর রহমত, সন্তুষ্টি ও অনন্ত পুরস্কারের আবাস। সেখানে এমন সব নেয়ামত রয়েছে, যা দুনিয়ার কোনো মানুষের কল্পনারও অতীত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন কিছু প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তর কল্পনাও করেনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭৭৯)
জান্নাতের দরজায় সর্বপ্রথম কড়া নাড়বেন মহানবী (সা.)
জান্নাতের মর্যাদা ও সম্মানের অন্যতম নিদর্শন হলো—রাসুলুল্লাহ (সা.) হবেন জান্নাতের দরজায় সর্বপ্রথম কড়া নাড়নেওয়ালা ব্যক্তি। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজায় কড়া নাড়ব।
’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, জান্নাতের প্রহরী তাঁকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘আপনি কে?’ তিনি বলবেন, ‘মুহাম্মদ।’ তখন প্রহরী বলবেন, ‘আপনার জন্যই আমাকে আদেশ করা হয়েছে—আপনার আগে আর কারও জন্য দরজা খুলব না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৭)
জান্নাতে নেই বার্ধক্য, নেই মৃত্যু
দুনিয়ায় মানুষের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—জীবন ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু জান্নাতে প্রবেশের পর মুমিনের জন্য আর কোনো মৃত্যুর ভয় থাকবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতবাসীরা জান্নাতে প্রবেশ করার পর ঘোষণা করা হবে, ‘তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না; তোমরা জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যুবরণ করবে না; তোমরা তরুণ থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না এবং তোমরা সুখে থাকবে, কখনো দুঃখ-কষ্টে পড়বে না। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮৩৭)
আল্লাহর কাছে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান চাইতে হবে
মুমিন যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে, তখন তার উচিত জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা কামনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে, তখন ফেরদাউস চাইবে। কারণ তা জান্নাতের মধ্যবর্তী ও সর্বোচ্চ স্থান।’ এর ওপরে রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর আরশ এবং সেখান থেকেই জান্নাতের নদীগুলো প্রবাহিত হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৯০)
যা পান করার পর আর তৃষ্ণা থাকবে না
জান্নাতের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাউজে কাউসারেরও বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। কিয়ামতের ময়দানে তাঁর উম্মতের জন্য একটি হাউজ থাকবে। এর পানি হবে দুধের চেয়েও শুভ্র এবং মিশকের চেয়েও সুগন্ধময়। এর পাত্র হবে আকাশের তারকার মতো অসংখ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তা থেকে পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫৭৯)
জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত—আল্লাহর দিদার
জান্নাতের প্রাসাদ, নদী, বাগান, ফলমূল, পানীয়, সৌন্দর্য—সবই মহান নেয়ামত। কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে রয়েছে এমন একটি নেয়ামত, যার সামনে জান্নাতের অন্যান্য সব আনন্দও ম্লান হয়ে যাবে। সেটি হলো—মহান আল্লাহর দীদার লাভ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেদিন কিছু মুখমণ্ডল হবে উজ্জ্বল; তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।’ (সুরা : কিয়ামাহ, আয়াত : ২২–২৩)
জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক রাতে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে এমন স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা এই চাঁদকে দেখছ; তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৫৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৩৩)
জান্নাত পাওয়ার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি
জান্নাতের এই বর্ণনা শুধু হৃদয়কে আনন্দ দেওয়ার জন্য নয়; বরং মুমিনকে আমলের পথে এগিয়ে দেওয়ার জন্য। যে ব্যক্তি জান্নাত কামনা করে, তাকে তার জন্য পরিশ্রমও করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা অগ্রগামী, তারাই তো অগ্রগামী। তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে নেয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতসমূহে।’ (সুরা : ওয়াকিয়াহ, আয়াত : ১০–১২)
আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করুন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত নসিব করুন, হাউজে কাউসারের পানি পান করার সৌভাগ্য দান করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউসে প্রবেশ করিয়ে তাঁর পবিত্র দীদার লাভের নেয়ামত দান করুন। আমিন।
