ইসলাম সুষমা ও সৌন্দর্যের ধারক। ইসলাম মানুষকে সবকিছুতে সুন্দরতমের অনুসরণ করতে বলে। তবে ইসলাম চায় সার্বিক সৌন্দর্য, ভেতর ও বাইরের সৌন্দর্য। ভেতরে কদর্য লুকিয়ে রেখে বাহ্যিক সৌন্দর্য ধারণ ইসলামের দৃষ্টিতে মূল্যহীন। আবার শুধু ভেতরের সৌন্দর্য লালন করা এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করাও ইসলামের দৃষ্টিতে অনুচিত।
আল্লাহ সৌন্দর্য পছন্দ করেন
একজন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ সৌন্দর্য পছন্দ করেন এই ঘোষণা দিয়ে ইসলাম মুমিনের অন্তরে সৌন্দর্যের ভালোবাসা জাগ্রত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)
আল্লাহর সৃষ্টিকুশলতায় সৌন্দর্য
মহান আল্লাহ যে সৌন্দর্য পছন্দ করেন তার প্রমাণ তার সুবিশাল সৃষ্টিজগৎ। যেকোনো চিন্তাশীল মানুষ আল্লাহর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে সহজেই বুঝতে পারবে আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে আছে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। পবিত্র কোরআনে সৃষ্টিজগতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে বান্দার ভেতর সৌন্দর্যের চাহিদা জাগ্রত করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করেছি। (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ৬)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং তাতে উদ্গত করেছি নয়ন প্রীতিকর সব ধরনের উদ্ভিদ।’ (সুরা : কাফ, আয়াত : ৭)
মানুষ সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি
আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টিই সুন্দর। তবে সবচেয়ে বেশি সুন্দর মানুষ। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে সর্বোত্তম অবয়ব দান করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তিনি তোমাদের আকৃতি দান করেছেন, ফলে তিনি তোমাদের সর্বোত্তম আকৃতি দান করেছেন। (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬৪)
ইসলামের সৌন্দর্য ভাবনা
সৌন্দর্য আল্লাহ প্রদত্ত। আল্লাহ তাআলা জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কল্যাণকামিতার বিবেচনায় কাউকে বাহ্যিকভাবে অধিক সৌন্দর্য দান করেছেন আবার কাউকে তুলনামূলক কম সৌন্দর্য দিয়েছেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মূল্যায়নে ভিত্তি যে অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য, তা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে সবার জন্য। ব্যক্তি নিজের চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে ভেতরগত সৌন্দর্যে চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হতে পারবে। সৌন্দর্যের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিকোণ হলো—
১. অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যই মূল : ইসলামের দৃষ্টিতে ভেতরগত ও বাহ্যিক উভয় প্রকার সৌন্দর্যই মূল্যবান। কিন্তু ইসলাম বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেয়। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন দোয়া শিখিয়েছেন, যেখানে বাহ্যিক সৌন্দর্যের কৃতজ্ঞতা আদায় করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য কামনা করা হয়েছে। তিনি শিখিয়েছেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি যেমন আমার অবয়বকে সুন্দর করেছেন, তেমনি আমার চরিত্রকেও সুন্দর করে দিন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৩৭২)
২. বাহ্যিক সৌন্দর্যও মূল্যবান : তবে বাহ্যিক সৌন্দর্যও ইসলামের দৃষ্টিতে মূল্যবান। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বনি আদম! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
মুমিনের জীবনে সৌন্দর্যের নানা দিক
যেহেতু ইসলাম মুমিনকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার সৌন্দর্যের অধিকারী হতে বলে। তাই মুমিন উভয় থেকে সৌন্দর্যের চর্চা করবে। যার কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো—
১. কথার সৌন্দর্য : মুমিন তাঁর সুন্দর ও শালীন ভাষায় কথা বলবে। মহান আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৮৩)
২. অশ্লীলতা পরিহার করা : ইসলাম সব ধরনের অশ্লীলতা অপছন্দ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অশ্লীলতায় জড়িত ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না এবং যারা অশ্লীলতা ছড়ায় তাদেরও পছন্দ করেন না।’(আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৩১০)
৩. ধৈর্য ও সংযম : ধৈর্য ও সংযম মুমিনজীবনের অন্যতম সৌন্দর্য। পবিত্র কোরআনে ধৈর্যকে সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ইয়াকুব বলল, না, তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনি সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই সুন্দর। হয়তো আল্লাহ তাদের একসঙ্গে আমার কাছে এনে দেবেন। অবশ্য তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৩)
৪. পোশাক-পরিচ্ছদের সৌন্দর্য : ইসলাম সাধ্যমতো উত্তম পোশাক পরতে উৎসাহিত করে। উত্তম পোশাকের অর্থ শুধু দামি বা মূল্যবান নয়, বরং তার অর্থ হলো শালীন, মার্জিত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বনি আদম! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
৫. অহেতুক বিষয় পরিহার করা : অহেতুক বিষয় পরিহার করাও মুমিনের জীবনের অন্যতম সৌন্দর্য। অহেতুক কাজ হলো প্রত্যেক এমন কাজ, যার পার্থিব বা পরকালীন কোনো কল্যাণ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সুন্দর মুসলিম হওয়ার একটি নিদর্শন হলো, অর্থহীন কাজ ত্যাগ করা।’ (তিরমিজি, হাদিস ২৩১৮)
৬. চরিত্র রক্ষা করা : মুমিনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চরিত্রবান হওয়া। নিজের চাহিদা পূরণের জন্য সে কোনো অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে না, বরং আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংযত রাখে। ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত। এবং মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফজত করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০-৩১)
৭. আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করা : মুমিনের সৌন্দর্যের আরো একটি দিক হলো আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করা। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন যে তোমরা আমানত তার হকদারকে আদায় করে দেবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
৮. সুরের সৌন্দর্য : শরিয়ত অনুমোদিত স্থানে ইসলাম সুর-ছন্দের চর্চাকে অনুমোদন দিয়েছে। যেমন সুললিত কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত করা। আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু মুসাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘গত রাতে আমি যখন তোমার কোরআন পাঠ শুনছিলাম তখন যদি তুমি আমাকে দেখতে তাহলে খুব খুশি হতে। তোমাকে তো দাউদ (আ.)-এর মতো সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর দেওয়া হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭৩৭)
আত্মশুদ্ধি সৌন্দর্য বৃদ্ধির উপায়
মুমিনের জীবনে সৌন্দর্য বৃদ্ধির প্রধান মাধ্যম হলো আত্মশুদ্ধি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন দেখবে মানুষ কৃপণতা করছে, প্রবৃত্তির পেছনে ছুটছে, পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, প্রত্যেকে নিজের মতামতে মুগ্ধ, এমন পরিস্থিতিতে সংশোধনে বিশেষ মনোযোগ দাও। সাধারণ মানুষের পথ পরিহার করো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩৪১)
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সেই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সেই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৭-১০)
