ম্যাজিকম্যান আরিফুল হক চৌধুরীর উত্থান যেভাবে..
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জীবনগল্প কেবল রাজনৈতিক পদ-পদবির তালিকা নয়—বরং সংগ্রাম, কৌশল, আস্থা, বিতর্ক, পতন এবং অভাবনীয় প্রত্যাবর্তনের এক পূর্ণাঙ্গ উপাখ্যান। সিলেটের মানুষের কাছে ‘আরিফ’ নামেই বেশি পরিচিত আরিফুল হক চৌধুরীর জীবনপথ তেমনই এক নাটকীয় অভিযাত্রা। ওয়ার্ড কমিশনার থেকে টানা দুইবারের সিটি মেয়র, সেখান থেকে সংসদ সদস্য এবং সবশেষে পূর্ণ মন্ত্রী—এই উত্থান কেবল রাজনৈতিক সাফল্যের নয়, বরং ব্যক্তিত্ব, সংগঠন দক্ষতা ও জনআস্থার এক দীর্ঘ পরীক্ষার ফল।
ছাত্ররাজনীতি থেকে জননেতা
আরিফুল হকের রাজনৈতিক হাতেখড়ি ছাত্রদলের মাধ্যমে। এমসি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি, শহর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক—প্রতিটি স্তরে সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁকে শাণিত করে। পরে তিনি সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা।
এই দীর্ঘ সংগঠন-ভিত্তিক পথচলা তাঁকে তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রেখেছে। তাঁর সমর্থকদের ভাষায়—“আরিফ ভাই নেতা হওয়ার আগে কর্মী ছিলেন, আর আজও নিজেকে কর্মী ভাবেন।”
সাইফুর রহমানের আস্থাভাজন: ‘ডিপ্লোমেটিক লিডার’
২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর জনপ্রতিনিধিত্বের শুরু। কিন্তু এর আগেই তিনি নজরে আসেন সিলেট-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান–এর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে।
সাইফুর রহমান তাঁকে ডাকতেন ‘ডিপ্লোমেটিক লিডার’। নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির দায়িত্ব পেয়ে আরিফ হয়ে ওঠেন নগর উন্নয়নের কার্যত প্রধান সমন্বয়ক। সিলেট নগরের অবকাঠামোগত পরিকল্পনা, সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ—এসব উদ্যোগে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাঁকে অনেকে বলতেন ‘ছায়া মেয়র’, আবার কেউ কেউ ‘ছায়া অর্থমন্ত্রী’।
এই সময়েই তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, দরকষাকষির ক্ষমতা এবং কৌশলী রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার গুণ সামনে আসে।
পতন, কারাবাস ও কঠিন সময়
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়, যেটি ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত, সারা দেশের মতো সিলেটের রাজনীতিতেও নেমে আসে অনিশ্চয়তার ছায়া। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দেশের শীর্ষ ৫০ জন কথিত দুর্নীতিবাজের তালিকায় উঠে আসে আরিফুল হক চৌধুরী–এর নাম। এক সময়ের প্রভাবশালী নগর রাজনীতিক হঠাৎ করেই হয়ে ওঠেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। শুরু হয় তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ, মামলা—অবশেষে তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়।
রাজনৈতিক জীবনে এটি ছিল তাঁর প্রথম বড় ধাক্কা—এবং সবচেয়ে নির্মম। যাঁরা একসময় তাঁর চারপাশে ভিড় করতেন, তাঁদের অনেকেই দূরত্ব তৈরি করেন। প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রভাব, দলীয় অবস্থান, রাজনৈতিক দাপট—সব যেন মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। সমর্থকরা বিচলিত, বিরোধীরা উচ্ছ্বসিত, আর তিনি নিজে দাঁড়িয়ে যান এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
এই সময়টাকে আরও কঠিন করে তোলে তাঁর রাজনৈতিক অভিভাবক এম সাইফুর রহমান–এর মৃত্যু। সাইফুর রহমান ছিলেন তাঁর উত্থানের অন্যতম ভিত্তি—পরামর্শদাতা, অভিভাবক এবং রাজনৈতিক ছায়া। সেই আশ্রয় হারিয়ে তিনি কার্যত একা হয়ে পড়েন। দলে তাঁর অবস্থান দুর্বল হতে থাকে, নেতৃত্বের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যান। অনেকেই বলতে শুরু করেন—আরিফুল হকের রাজনৈতিক অধ্যায় বুঝি এখানেই সমাপ্ত। কিন্তু ইতিহাসের বাঁক অনেক সময় নির্ধারিত হয় সংকটের মধ্যেই।
কারাবাসের সময়টিকে তিনি নাকি আত্মসমালোচনা ও আত্মবিশ্লেষণের পর্ব হিসেবে নিয়েছিলেন—এমনটাই বলেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। ক্ষমতার চূড়া থেকে হঠাৎ পতন তাঁকে উপলব্ধি করায় রাজনীতির অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা এবং জনআস্থার প্রকৃত মূল্য। তিনি নীরবে সংগঠনের তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, পুরোনো কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করেন, এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।
এই সময়টাতে তাঁর কৌশলগত একটি পরিবর্তনও লক্ষ করা যায়—তিনি প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া বা সংঘাতে না গিয়ে অপেক্ষা ও ধৈর্যের পথ বেছে নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, প্রতিকূল সময়ে আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সময়কে নিজের পক্ষে আনার ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত ফল দেয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জনসংযোগ। বিতর্ক সত্ত্বেও তিনি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি। সিলেটের অনেক সাধারণ নাগরিক ও কর্মী তাঁর পাশে থাকেন। এই সমর্থনই তাঁকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রাখে এবং নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।
অনেকেই ভেবেছিলেন—এই অধ্যায়ের পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ। কিন্তু বাস্তবে এই কঠিন সময়ই হয়ে ওঠে তাঁর পুনর্জন্মের প্রস্তুতিপর্ব। পতনের গভীরতা তাঁকে শিখিয়েছে ধৈর্য, কৌশল এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ; আর সেই শিক্ষাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে আরও পরিণত ও হিসাবি নেতা হিসেবে গড়ে তোলে।
অতএব, ২০০৭–পরবর্তী অধ্যায় শুধু সংকটের গল্প নয়—এটি এক রাজনৈতিক চরিত্রের পরিপক্বতার গল্প, যেখানে অন্ধকারের মধ্যেই তৈরি হয় নতুন আলোর পথ।
কামরানকে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয়
২০১৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় ভেতরের আপত্তি সত্ত্বেও মেয়র পদে মনোনয়ন পান। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা, প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। অনেকেই ভেবেছিলেন, এ লড়াইয়ে আরিফের পক্ষে জয় অসম্ভব। কিন্তু ফলাফল বদলে দেয় হিসাব—তিনি জয়ী হন এবং প্রথমবার সিলেটের মেয়র নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালে যখন দেশের পাঁচ সিটি করপোরেশনের চারটিতে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়, তখন সিলেটেই একমাত্র বিএনপি প্রার্থী হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন আরিফ। টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে তিনি নিজেকে কেবল দলীয় নয়, বরং নগরবাসীর মেয়র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সাফল্য
দুই মেয়াদে তাঁর নেতৃত্বে সিলেটে যেসব ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে রয়েছে—প্রধান সড়ক ও উপ-সড়কের সংস্কার ও সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প,নগর পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ,পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানের উন্নয়ন। তিনি প্রশাসন, ব্যবসায়ী মহল ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য প্রশংসিত হন। তাঁর সমর্থকদের মতে, “তিনি সংঘাতের বদলে সমন্বয়ের রাজনীতি করেন।”
দলীয় শৃঙ্খলার নজির
২০২৩ সালের সিটি নির্বাচনে দলীয় নির্দেশে প্রার্থী না হয়ে তিনি রাজনৈতিক আনুগত্যের এক নজির স্থাপন করেন। এর ফলস্বরূপ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পদে উন্নীত হন। দলীয় সিদ্ধান্ত মানার এই দৃষ্টান্ত তাঁকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থার জায়গায় নিয়ে যায়।
নাটকীয় সংসদ নির্বাচন ও বিজয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমে সিলেট-১ আসনের মনোনয়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। পরে দলীয় নির্দেশে সীমান্তঘেঁষা সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হন। নতুন এলাকায় সংগঠন গড়ে তুলে অল্প সময়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।
নগরকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে গ্রামীণ ও সীমান্তাঞ্চলভিত্তিক নির্বাচনে জয়—এটি তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার বিস্তারকে প্রমাণ করে।
মন্ত্রীত্ব: নতুন দায়িত্ব, নতুন প্রত্যাশা
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন—এসব খাতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার প্রত্যাশা করছেন অনেকে।
শপথের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন:
“আমি বিএনপির একজন তৃণমূলের কর্মী থেকে এই পর্যায়ে এসেছি। কাউন্সিলর, মেয়র থেকে এখন মন্ত্রী—এ পথে আপনাদের সঙ্গ, দোয়া ও সহযোগিতাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, সবাইকে নিয়ে চলব। কোনো বৈষম্য ছাড়াই সকলের জন্য কাজ করব।”
কেন ‘ম্যাজিকম্যান’?
আরিফুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনকে ‘ম্যাজিক’ বলা হয় মূলত তাঁর প্রত্যাবর্তনের ক্ষমতার জন্য। দুর্নীতির অভিযোগের পরও ঘুরে দাঁড়ানো, দলীয় দ্বন্দ্ব পেরিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন,নগর থেকে গ্রাম—দুই পরিসরেই গ্রহণযোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য। তাঁর সমর্থকদের চোখে তিনি এক কৌশলী, ধৈর্যশীল এবং বাস্তববাদী নেতা—যিনি প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে জানেন।
ওয়ার্ড কমিশনার থেকে পূর্ণ মন্ত্রী—এই পথচলা কেবল পদোন্নতির ধারাবাহিকতা নয়; এটি জনআস্থা অর্জনের গল্প, সংগঠন গড়ে তোলার গল্প এবং পতনের পর পুনরুত্থানের গল্প। সিলেটের রাজনীতিতে তিনি এখন এক প্রতিষ্ঠিত নাম। সামনে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব—সেখানে তাঁর নেতৃত্ব কতটা সফল হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ‘ম্যাজিকম্যান’ অভিধার প্রকৃত মূল্য।
তবে এ কথা অনস্বীকার্য—আরিফুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে এক বিরল অধ্যায়, যেখানে প্রতিটি পতনই পরবর্তী উত্থানের সোপান হয়ে উঠেছে।






